বাবারা কেন যে এমন হন!

বাবারা কেন যে এমন হন!
সন্তানের উপর তাঁরা যেন সবসময়ই প্রকাশ্যে কিংবা অপ্রকাশ্যে এক ধরনের রক্ষা কবচ হয়ে থাকতে চান। সন্তানের কর্মজীবনে বা চলার পথে কোনো পদক্ষেপে যদি সামান্যতম বিপদেরও আঁচ বাবারা অনুমান করতে পারেন, অথবা সম্পূর্ণ নতুন কোনো কাজ যদি কোনো সন্তান শুরু করতে চাই তাহলেও তাঁরা সবসময়ই উদ্বিগ্ন হয়ে থাকেন এবং ভেবেই নেন যে ছেলেরা এই কাজে ব্যর্থ হবে। তাই সেই অপরিচিত নতুন কর্মের প্রথম পদক্ষেপটিও বাবারা নিজের পায়েই শুরু করতে চান যেন কোনো বিপদ বা ব্যর্থ হবার সম্ভবনার কালো অধ্যায় তাদের সন্তানদের ভাগ্যরেখাকে স্পর্শ করতে না পারে।সকালবেলা আমন ধানের ক্ষেতের জন্য বাবার সাথে পাশের গ্রামে সার কিনতে গিয়ে জিহাদ এ কথাই ভাবছিলো।
বস্তুুতঃ তাঁদের স্নেহাধিক্য যদিও একান্তই সন্তানের কল্যাণবশত তবুও সেটার পরিমাণ সন্তানদের কাছে মাঝে মাঝেই যেমন মাত্রাতিরিক্ত ও অস্বস্তিকর লাগে তেমনি পীড়াদায়ক বোধ হয়। কারণ প্রতিটি সন্তানই এই সময়টাতে পরিকল্পনামাফিক স্বাধীনভাবে নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করে ভবিষ্যত পদক্ষেপের জন্য নিজের সামর্থ্যটুকু একবার নিজেই মেপে নিতে চাই।
বাবারা সারাজীবন বেঁচে থাকেন না। একটা সময় পরে এসে তাঁদের অতি যত্নে লালন করা রাজপুত্রদের হাত একাই জীবন যুদ্ধের জন্য ছেড়ে দিতে হয়। আবার কখনো কখনো নিষ্ঠুরতম লীলায় বাবার হাত ধরে জীবনের প্রথম পা হাঁটতে শেখার আগেই অজস্র সন্তান পিতৃহারা হয়ে জীবন যুদ্ধের ময়দানের ঠিক মাঝখানটায় এসে পড়ে। এ যুদ্ধের মাঝপথে এসে বেশিরভাগ সৈনিকই হতাশা এবং লোভ লালসার বশবর্তী হয়ে পড়ে, আবার অনেকেই জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, এই পৃথিবীটাই যেন তাদের জন্য না। এ যুদ্ধের ময়দানে সবাই বাঁচার মতো বেঁচে না থাকলেও টিকে সবাই থাকে। তাই আবার নতুন করে শুরু করার সম্ভবনার সুযোগটা প্রকৃতি সবার জন্যই রেখে দেয়। কিন্তু বাবারা এটা কখনোই বুঝতে চান না, তাঁরা ভাবেন তাঁদের অনুপস্থিতিতে সন্তানেরা সবসময়ই বড় অসহায় এবং একবার কেউ কোনো প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হলে তার জীবনটাই শেষ।
বাবারা সবসময় চান যে পৃথিবী থেকে বিদায় নেবার আগে জীবনের রণাঙ্গনে তাঁরা তাঁদের সন্তানের চারপাশে এমন একটা দূর্গ তৈরির ব্যবস্থা করবেন যে সেই দূর্গের মাঝখানে তাঁদের আদরের রাজপুত্ররা জীবনের বাকি অংশটা রাজার হালে কাটিয়ে দিতে পারবে এবং বাইরের কোনো ঝোড়ো দমকা হাওয়া এসে ওদের জীবনটাকে এলোমেলো করতে পারবে না।
দুই একজনের ভাগ্যে অবশ্য এই নিরবিচ্ছিন্ন সুখ জুটে থাকলেও অধিকাংশ সন্তানদের কপালে সেটা লেখা থাকে না। ফলশ্রুতিতে অধিকাংশ সময় বাবারা যেমন একটা দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরও ব্যর্থ হয়ে হাল ছেড়ে দেয় তেমনি জীবনের মাঝপথে এসে বেশিরভাগ সন্তানই একা হয়ে পড়ে, জীবন যুদ্ধের বাকিটা পথ তাদেরকে একাই হাঁটতে হয়।
পিতৃ আশির্বাদের এই সৌভাগ্য সুখ জিহাদের কপালেও সইতে পারতো, কিন্তু জিহাদ সেটা চাইনি। নিজের চার আঙুলের ছোট কপালটাতে সে নিজের হাতেই নিজের ভাগ্যরেখা আঁকতে চেয়েছিল।
এমএ পাস করে দীর্ঘ দুই বছর ধরে জিহাদ সরকারি চাকরির পিছনে ছুটে যখন শুধুমাত্র কয়েক লক্ষ ঘুষের টাকার জন্য সমাজের নীতিহীন দুর্নীতিবাজদের হাতে নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র ও এতোদিনের পরিশ্রমকে নিতান্তই তুচ্ছ ও অসহায় হয়ে পড়তে দেখেছে তখনই শহরের সবকিছু ছেড়ে দিয়ে চাকরি করার চিন্তা বাদ দিয়ে সোজা গ্রামে চলে আসে বাবার সাথে নিজেদের জমিতে কৃষি কাজ করতে।
জিহাদের বাবা জহর আলী ছেলেকে সবসময় সৎপথে চলার এবং বিবেকবান হবার পরামর্শ দিয়েছেন। তাই তাঁর শিক্ষিত ছেলে যখন নিজের বিবেককে ছোট না করে, সততাকে বিসর্জন দিয়ে অসৎপথে না গিয়ে, কারও হাত পায়ে না ধরে জীবীকা অর্জনের জন্য নিজের আত্মসম্মানকে ছোট না করে চাকরি করেনি তখনও তিনি যেমন খুশি মনেই ছেলের আত্মপ্রচেষ্ঠায় জীবন নির্বাহের এই যুদ্ধে মন থেকে ছেলেকে আশির্বাদ করেছেন তেমনি জিহাদের জীবনের বাকিটা পথ এই রোদ-বৃষ্টি, কাঁদা আর ঝড়ের মধ্যে কাটবে জেনেও বুকের মাঝে গর্ব অনুভব করেছেন।
কৃষি কাজ আসলেই কঠোর পরিশ্রমের, তাই বাড়িতে আসার পরে জিহাদ তার বয়স্ক বাবাকে সকল কাজকর্ম থেকে অবসরে গিয়ে বিশ্রাম নিতে বলে। কিন্তু অনভিজ্ঞ সন্তানকে তার জীবনের মাঝপথে এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে একা ছেড়ে দিতে তিনি কখনোই রাজি ছিলেন না। তাছাড়া হঠাৎ করেই কৃষি কাজ ও নিজের পরিবার পরিচালনার মতো জীবীকা ও জীবনের এমন গুরু দায়িত্ব ছেলের কাঁধে তুলে দিয়ে তার হাত ছেড়ে ঘরে বসে বিশ্রাম নেওয়াটা জহর আলীর কাছে সমীচীন মনে হয়নি।
জহর আলীর সংসারে কোনো অভাব অনটন না থাকলেও ধনসম্পদ বা সঞ্চয়ের পরিমাণ বলতে বিশেষ কিছু ছিলো না, জীবনের উপার্জিত অর্থের প্রায় সবটাই তিনি জিহাদের শিক্ষার পিছনে উদার হাতে খরচ করেছেন। তাই জিহাদের অনভিজ্ঞতায় যদি পরপর কয়েকটি আবাদ নষ্ট হয়ে যায় তাহলে বাপ ছেলে দুজনকেই তখন অন্যের ক্ষেতে দিনমজুরি করে জীবীকা নির্বাহ করতে হবে। সেজন্যই তিনি কৃষি কাজের যাবতীয় ফসলের চাষ পদ্ধতি জিহাদের সাথে থেকে তাকে হাতে কলমে শিখিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নেন।
জিহাদের গ্রামে কোনো রাসায়নিক সারের দোকান নেই, তাছাড়া অধিকাংশ কৃষকের বাড়িতেই তাদের উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ জায়গা নেই। ফলে ধান, পাট, গম, ডাল ইত্যাদি শস্য ঘরে ওঠার সাথে সাথেই নিরুপায় হয়ে স্বল্প মূল্যে বিক্রি করে দিতে হয়, এতে কৃষকদের প্রচুর আর্থিক ক্ষতি হয়ে থাকে। জিহাদ অবশ্য দুই তিন বার তার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের নিয়ে গ্রামের কৃষকদের একত্রিত করে সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটা সারের দোকান এবং একটা গুদামঘর নির্মাণ করার প্রস্তাব করেছে। কিন্তু গ্রামের অশিক্ষিত মানুষেরা অধিকাংশ সময় সমবেত হয়ে কাজ করার সুবিধা বুঝতে পারে না, এককভাবে নিজেদের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকে তাই জিহাদ কৃষকদের উন্নতির আশা ছেড়ে দিয়েছে।
জহর আলীদের আমন ধান রোপণের পর প্রায় দিন পনের পেরিয়ে গেছে, ধানক্ষেতে এখন অনতিবিলম্বে সার দেয়া অতি জরুরী। কিন্তু কয়েকদিন ধরে নিম্নচাপের প্রভাবে অনবরত বৃষ্টি হচ্ছে। গ্রামের মেঠোপথের মাঝে মাঝেই প্রায় একহাঁটু পরিমাণ কাঁদা জমে গেছে।
নিজেদের গ্রামে রাসায়নিক সারের কোনো দোকান নেই, তাই পাশের গ্রাম থেকে সার আনতে হবে। সকাল সকাল ভাত খেয়ে ছাতা মাথায় দিয়ে জহর আলী তার বাই সাইকেল নিয়ে বের হলেন সার আনতে। কিন্তু মাথার উপর বৃষ্টি আর পায়ের নিচে এক হাঁটু পরিমাণ কাঁদা রাস্তায় বাবাকে একা ছাড়তে মন সরলো না জিহাদের, তাই পলিথিনের ব্যাগটা হাতে নিয়ে সেও বাবার সাথে রওনা দিলো।
পাশের গ্রাম থেকে যখন পঞ্চাশ কেজি ওজনের দুই বস্তা সার সাইকেলে চাপিয়ে বাবার অনিচ্ছা সত্ত্বেও জিহাদ ওনার কাছ থেকে সাইকেল নিয়ে ওদের মাঠের রাস্তার দিকে চলতে শুরু করলো তখন বুঝতে পারলো শ্রাবণের এই কর্দমাক্ত রাস্তায় একা একা কোনোভাবে চালিয়ে আসা গেলেও সার বোঝাই সাইকেল ঠেলে নিয়ে যেতে জীবন বের হয়ে যাবার মতো অবস্থা হবে।
সার ছিটানোর গামলা, পলিথিন আর ছাতা হাতে জিহাদের বাবা জিহাদের সাথে ঠিক পিছন পিছন আসতে লাগলো আর একবার রাস্তায় কাঁদার দিকে, আরেকবার আকাশের দিকে তাকিয়ে জিহাদ সাইকেল ঠেলতে লাগলো। বৃষ্টি থামলেও আকাশে মেঘের বিরাম নেই। যে কোনো সময় মুষলধারে বৃষ্টি নামতে পারে। জিহাদ যথাসম্ভব দ্রুত সাইকেল ঠেলতে চেষ্টা করছিলো কিন্তু কাঁদাজলের মাঝে মাঝেই ওর পা পিছলে যাচ্ছিলো আর জহর আলী সাথে সাথেই পিছন থেকে একহাতে শক্ত করে সারের বস্তা ধরে সাইকেল আর ছেলেকে পড়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাচ্ছিলেন।
বিলের কাছে এসে ব্রিজ পার হওয়া মাত্রই মুষলধারে বৃষ্টি নামলো, জহর আলী তাড়াতাড়ি ছেলের মাথায় ছাতা দিয়ে, পলিথিন দিয়ে সাইকেলের উপর সারের বস্তা ঢেকে দিয়ে বৃষ্টির ছাঁট থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য মাথার উপর গামলা ধরলেন।
কৃষি কাজ জিহাদের রক্তে মিশে আছে, শহরে থেকে পড়াশোনা করলেও আবহমান গ্রাম বাংলার পায়ের নিচে এই এক হাঁটু পরিমাণ কাঁদা আর মাথার উপর তীব্র রোদ বৃষ্টি নিয়ে কাজ করা ওর অভ্যাস আছে। কারণ ছুটির দিনগুলোতে ও সবসময়ই ওর বাবার কাজে সাহায্য করার জন্য কলেজের মেস থেকে বাড়ি চলে আসতো।
বৃষ্টিতে ভিজতে জিহাদের কোনো অসুবিধা ছিলো না, ঠান্ডা জ্বরের তো কোনো প্রশ্নই নেই! কিন্তু বাবার মাথায় গামলা ধরে রাখা দেখে জিহাদের মনটা ছোট হয়ে গেলেও সে ছাতাটা নিজের মাথা থেকে বাবার কাছে দিতে পারলো না, তাহলে সারগুলো ভিজে নষ্ট হয়ে যাবার সম্ভবনা আছে।
বৃষ্টির তীব্রতার জন্য জিহাদেরা একটা খেজুর গাছের নিচেই দাঁড়িয়েছিলো। কিন্তু বয়স্ক বাবাকে ভিজতে দেখে জিহাদ ভাবলো এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে শুধু শুধু ভেজার কোনো মানে হয় না। পলিথিনটা ভালো করে ধরে, ছাতাটা বাবার হাতে দিয়ে বাবার নিষেধকে অগ্রাহ্য ও আবার সাইকেল ঠেলতে শুরু করালো। মাঠের রাস্তাটায় দূর্বা ঘাসের জন্য চলতে সুবিধা হলেও ইঁদুরের গর্ত আর আর মালবাহী ট্রাক্টরের অতিরিক্ত চলাচলের জন্য রাস্তার মাঝে মাঝে মাটি ভেঙে গর্ত হয়ে গেছে।
ধানক্ষেতের কাছে আসার পরে জিহাদের মস্তিষ্ক মোটামুটি বড় ধরনের একটা ধাক্কা খেলো, সাথে সাথে ওর দুই হাতের মুঠো আর গালের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল আর এক পলকের জন্য দুই চোখ বন্ধ হয়ে গেলো। বৃষ্টির স্রোত নেমে রাস্তার মাঝখানে এক জায়গায় ইঁদুরের গর্ত থেকে মাটি বের হয়ে গেছে। কিন্তু সমতল রাস্তার উপর থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে এই মাটির নিচ থেকে মাটি সরে গিয়ে অনেকটা ফাঁকা হয়ে গেছে। জিহাদ সেখানে বাম পা দিতেই উপরের মাটির আবরণ ভেঙে প্রায় হাঁটু পর্যন্ত ওর পা মাটির নিচে তলিয়ে গেল। নিশ্চিতভাবেই সার বোঝাই সাইকেল মাটিতে পড়ে গেছে ভেবে ভয়ে ভয়ে জিহাদ ধীরে ধীরে ওর চোখ মেলে দেখলো। না পড়েনি, ও নিজে যেমন এক পা তলিয়ে গিয়েও দাঁড়িয়ে আছে, তেমনি দাঁড়িয়ে আছে সাইকেল, ডানে বামে কোথাও এতটুকু কাত হয়ে যায়নি। অভ্যাসবশত সাইকেলের দুই ব্রেক চেপে ধরে আছে ও, কিন্তু তবুও একশ কেজি ওজনের বোঝাই সাইকেল পড়ে যাবার কথা। এবার আস্তে আস্তে জিহাদ পিছনের দিকে তাকালো, না সাইকেল পড়ার কোনো সম্ভবনা নেই, অন্তত এইসব ছোট খাটো ইঁদুরের গর্তে, যদি ওর সহযোদ্ধা কখনো ওর হাত না ছাড়ে।
জহর আলী ছেলেকে বললেন সাইকেল ছেড়ে দিয়ে গর্ত থেকে উঠে আসতে। তাঁর একহাতে সার ছিটানোর গামলা আর অন্য হাতে সার বোঝাই সাইকেল তিনি ইস্পাতের ন্যায় শক্ত করে ধরে রেখেছেন। যা ফসকে যাওয়ার ক্ষমতা এই মাত্র একশো কেজি সার বোঝাই করা সাইকেলের নেই। তাঁর এই হাত শুধু নিড়ানি,কাস্তে ধরা একজন কৃষকের হাত নয়, এই হাত একজন যোদ্ধার হাত। একটা পরিবার রক্ষা করার যোদ্ধা তিনি, ছেলেকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার মহান সৈনিক তিনি। পৃথিবীর বুকে টিকে থাকার এই যুদ্ধে তিনি এতো সহজে তাঁর ছেলেকে ছিঁটকে পড়ে যেতে দিতে পারেন না। অন্তত এমন ইঁদুরের গর্তের মতো ছোট খাটো পথের বাধার কাছে তো নয়ই। এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে তিনি তাঁর একমাত্র উত্তরসূরী এই নতুন সৈনিককে জীবন যুদ্ধের এই ময়দানে একজন অভিজ্ঞ সৈনিক হিসেবে, একজন সহযোদ্ধা হিসেবে কখনোই একলা ছাড়বেন না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top