ফোবিয়া (Phobia)

“ফোবিয়া (Phobia)” কি?  আমরা সবাই এই শব্দটির সাথে একটু হলেও কম বেশি পরিচিত। ভয় মনের অবচেতন স্তরের একটি বিশেষ মানসিক অবস্থা, যার নির্দিষ্টতা আছে কিন্তু ভয় যখন নির্দিষ্টতা অতিক্রম করে, একে ভয়রোগ বা  ভীতিরোগ বা ফোবিয়া বলে। ভয় আমাদের সবার একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। কোনও কারণে আমাদের বিপদের আশঙ্কা থাকলে সহজাত ভাবেই আমাদের ভয় করে। অনেকেই অন্ধকারে বা সাপ দেখে বা প্লেনে চড়তে ভয় পান। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের এই ভয় বা ফোবিয়া অযৌক্তিক হয় এবং তাঁর ফলে ব্যক্তি সাংঘাতিক আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। উদাহরণস্বরূপ, উচ্চতায় ভয় পান এহেন ব্যক্তি হয়ত উঁচু বাড়ি দেখেই ভয় পেয়ে গেলেন বা সাপে ভীতি থাকার দরুন টিভিতে সাপ দেখে ভয় পেয়ে গেলেন।

ফোবিয়া একটি মানসিক ব্যাধি বা মেন্টাল ডিসঅর্ডার। যখন কারো ফোবিয়া থাকে তখন সেই ব্যক্তি সেই ঘটনা বা সিচুয়েশন বা বস্তুর উপর মারাত্মক ভয় অনুভব করে। সাধারণ ভয় থেকে ফোবিয়ার পার্থক্য হচ্ছে, ফোবিয়া মূলত মানসিক সমস্যা হিসেবে রুপ নেয়। ফোবিয়ার কারণে দুশ্চিন্তা, উদ্বিগ্নতা, স্ট্রেস, ডিপ্রেশন, হাই ব্লাড প্রেসার থেকে শুরু করে স্ট্রোকের মাধ্যমে মৃত্যু পর্যন্তও হতে পারে। যারা ফোবিয়ায় আক্রান্ত তারা সেই ভয়ের পয়েন্ট থেকে কোনো চিন্তা না করেই সরাসরি এভয়েড করে চলে।

ফোবিয়া মূলত এক ধরনের উদ্বেগজনিত রোগ। যদিও এটা বেশ কমন একটা রোগ। শুধুমাত্র আমেরিকার তরুণদের ৩০ শতাংশের বেশিই উদ্বেগজনিত রোগে ভুগছেন। যদিও বেশিরভাগ ফোবিয়াই ছোটো থেকে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে কিন্তু বড় হওয়ার পরেও এটার উন্নতি হতে পারে। যার ফোবিয়া রয়েছে, সেও কিন্তু জানে যে, তার এই ভয় পাওয়াটা অস্বাভাবিক আর অযৌক্তিক। কিন্তু তারপরেও সে ভয় পেয়ে চলে। এটাকে সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

ফোবিয়ার উপসর্গ:

⭐ সঙ্গত কারণ না থাকা সত্ত্বেও বিশেষ কিছু পরিস্থিতি বা জিনিষের থেকে অযৌক্তিক ভয় পাওয়া।

⭐ ভয়ের জন্য সেই সমস্ত পরিস্থিতি এবং জিনিষ এড়িয়ে চলা।

⭐ এইরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে পরে অসুস্থবোধ যেমন রক্তচাপ বৃদ্ধি পাওয়া, মাথা ঘোরানো বা ঘামে ভিজে যাওয়ার মত সমস্যা।

ফোবিয়ার কারণ:

⭐ শিশু অবস্থায় ঘটা কোন দুর্ঘটনা: ছোটবেলায় কোনো দুর্ঘটনার কারণে কোনো কিছুর প্রতি ভয় সৃষ্টি হলে পরবর্তীতে এটি ফোবিয়াতে পরিণত হয়।

⭐ পারিবারিক ইতিহাস: বাবা-মায়ের বিশেষ কিছুতে ভয় থাকলে সন্তানেরও তাই নিয়ে ভীতি তৈরি হবার সম্ভাবনা থাকে।

⭐ অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা এবং মানসিক চাপ।

 এমন বেশ কিছু ফোবিয়া আছে যা অজান্তেই আমাদের মনে বাসা বাঁধে, বাড়তে থাকে ধীরে ধীরে। ফোবিয়া অনেক ধরনের হতে পারে। কিন্তু আজ তেমনই কিছু অদ্ভুত ফোবিয়ার সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

নেফোফোবিয়া (মেঘ-ভীতি):

নেফোফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি মেঘের ভয়ে সারাক্ষণ আতঙ্কিত থাকেন। এমনকি তাঁরা আকাশের দিকে তাকাতেও ভয় পান। এই ফোবিয়ার মতোই আরেকটি ফোবিয়া আছে যার নাম অ্যানাবলফোবিয়া। অ্যানাবলফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি উপরের দিকে তাকাতেও ভয় পান। আকাশ, বাড়ির ছাদ, উঁচু গাছ, এমনকি উঁচু বহুতলের দিকে তাকাতেও ভয় পান তাঁরা।

 স্পেকট্রোফোবিয়া (আয়না-ভীতি):

স্পেকট্রোফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বকেও ভীষণ ভয় পান। এই ফোবিয়ার আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের ব্যক্তিসত্ত্বা নিয়ে আতঙ্কে থাকেন বা নিজের ত্বকের সামান্য দাগও সহ্য করতে পারেন না। অতীতের কোনও ভয়ঙ্কর ঘটনা থেকেও অনেকের আয়না-ভীতি তৈরী হতে পারে।

 হেডোনোফোবিয়া (আনন্দ-ভীতি):

পৃথিবীর এমন কিছু মানুষ আছেন যাঁদের আনন্দেও ভীতি কাজ করে। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও এটাই সত্যি। এ ফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি উপভোগ্য মূহূর্তগুলোকে ভয় পান। তাঁরা আনন্দ পেতে ও প্রকাশ করতে ভয় পান। এ ধরণের সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা সমাজের সবার থেকে আলাদা থাকতে পছন্দ করেন। তাই তাঁদের স্বাভাবিক সামাজিক জীবন-যাত্রা ব্যাহত হয়।

 টেলিফোবিয়া (টেলিফোন-ভীতি):

১৯৯৩ সালে বৃটেনের একটি গবেষণায় দেখা যায়, যে সে দেশের প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষের মধ্যে টেলিফোন-ভীতি (টেলিফোবিয়া) আছে। এই ফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা ফোন রিসিভ করতে বা ফোনে কথা বলতে ভয় পান ও এক ধরনের তীব্র মানসিক চাপ অনুভব করেন। তাঁরা ফোনে কি বলবেন তা বুঝে পান না এবং এক ধরনের অস্বস্তিতে ভোগেন। তাঁরা সব সময়েই ফোন এড়িয়ে চলতে পছন্দ করেন।

অ্যান্থোফোবিয়া (ফুল-ভীতি):

শুনতে অদ্ভুত লাগলেও পৃথিবীতে কিছু মানুষ ফুলের ভয়ে সারাক্ষণ আতঙ্কিত থাকেন। এই ধরনের মানুষ ফুল দেখলে বা ফুলের কাছাকাছি থাকলে এক ধরণের মানসিক চাপ অনুভব করেন। অনেকে আবার পুরো ফুলটাকে ভয় না পেয়ে ফুলের বিশেষ কোন অংশ যেমন পাপড়ি বা রেণু ভয় পান।

ফোবিয়ার চিকিৎসা:

সাধারণত কোন ফোবিয়া থাকলে সেটাকে এড়িয়ে যাওয়াটাই আমাদের অভ্যাস। যেহেতু দৈনন্দিন জীবনে এর কোনও প্রভাব থাকে না তাই আমরা এই সমস্ত জিনিষ বা পরিস্থিতি এড়িয়ে চলাটাই পছন্দ করি। কিন্তু এই অভ্যাস এর সমাধান নয়। মনোবিদের সহায়তায় নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতিতে ভয়ের সম্মুখীন হলে এবং সঠিক ওষুধের সেবনে ফোবিয়ার সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব।
এছাড়াও ব্যক্তিগত কিছু উদ্যোগের মাধ্যমেও ফোবিয়া নিরাময় করা সম্ভব। যেমন:

রোগীর যত্ন নেওয়া:
কখনো তাঁদের সাথে জোর করবেন না বা ভয় নিয়ে মজা করবেন না। মনে রাখবেন ওই পরিস্থিতি বা জিনিসগুলি তাঁদের কাছে সাংঘাতিক আতঙ্কের। বরং তাঁকে সঠিক চিকিৎসা নিতে উৎসাহ নিন এবং সেই মত সাহায্য করুন।

ভয়ের সাথে মকাবিলা:
আতঙ্কিত হবেন না। মাথা ঠাণ্ডা রেখে পুরো পরিস্থিতি বিচার করুন। বিভিন্ন লোকের সাথে এই নিয়ে কথা বললে দেখবেন ভয় সম্বন্ধে প্রকৃত যৌক্তিকতা তৈরি হবে। কিন্তু সবার আগে সঠিক মনোবিদের সাথে যোগাযোগ করুন।

ফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ফোবিক বলা হয়। আমাদের সকলের উচিত ফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি সচেতন থাকা এবং এটি নিরাময়ের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরী করা। এতে করে তারা তাদের ভয়কে কাটিয়ে উঠে সুস্থ হতে  পারবে।

 

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top