অনিদ্রা বা Insomnia

আমরা প্রায় সকলেই  “অনিদ্রা” বা “ইনসোমনিয়া” শব্দটির সাথে কমবেশি পরিচিত।ইনসোমনিয়া  বা অনিদ্রা হলো একটি ঘুমের ব্যাধি। এটি এমন একটি নিদ্রাহীনতার সমস্যা যা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রভাবিত করছে। এটি একজন ব্যক্তির ঘুমকে নষ্ট করে যার ফলে সে সারারাত ঘুমাতে পারে না। সম্পূর্ণ ঘুম না হওয়ার কারণে ব্যক্তি তার পুরো দিনের কাজে ক্লান্তি বোধ করেন। এছাড়াও অনিদ্রার কারণে একজন ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক প্রচুর সমস্যা হতে পারে। এটি শুধু মানুষের শারীরিক সমস্যা নয় বরং ব্যক্তির স্বভাবেও অনেক পরিবর্তন ঘটায় যেমন বিরক্ত, উদ্বেগ,স্ট্রেস ইত্যাদি।


আমেরিকান একাডেমি অফ স্লিপ মেডিসিনের ICSD-3 ম্যানুয়াল অনুসারে, অনিদ্রা সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে “ঘুমের দীক্ষা বা অনিদ্রা হলো সময়কাল, একীকরণ বা গুণমান নিয়ে অবিরাম অসুবিধা”। সাধারণত তিন ধরণের অনিদ্রা পরিলক্ষিত হয়। সেগুলো হলো: তীব্র, ক্ষণস্থায়ী এবং দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রা। ক্ষণস্থায়ী অনিদ্রা বেশিদিন স্থায়ী হয় না কিন্তু তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রা তিন মাসের প্রত্যেক সপ্তাহে ৩বার হয়ে থাকে। ক্ষণস্থায়ী অনিদ্রার ক্ষেত্রে অনেকে বুঝতে না পেরে এড়িয়ে চলতে চাই যার ফলে দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র অনিদ্রার উদ্ভব ঘটে। কিন্তু নিয়ম মেনে ডাক্তারের পরামর্শ মতো চললে এটাকে কমানো সম্ভব।

কারণ: অনিদ্রার প্রধান কারণ হলো মানসিক চাপ। একজন ব্যক্তির জীবনে অনেক সমস্যায় থাকতে পারে। পারিবারিক আর্থিক সমস্যা,পড়াশুনা ও কর্মরত শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ, মৃত্যুর শোক, দুর্ঘটনা ইত্যাদি মানসিক চাপের জন্য অনিদ্রা বা ইনসোমনিয়া হতে পারে। অনিদ্রার সাধারণ কারণগুলির মধ্যে রয়েছে স্ট্রেস, একটি অনিয়মিত ঘুমের সময়সূচী, ঘুমের খারাপ অভ্যাস, উদ্বেগ এবং হতাশার মতো মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাধি, শারীরিক অসুস্থতা এবং ব্যথা, ওষুধ, স্নায়ুজনিত সমস্যা এবং ঘুমের নির্দিষ্ট ব্যাধি। এছাড়াও ঘুমানোর পূর্বে উদ্দীপনাজনক কোনো কর্মকান্ড অথবা ঘুমানোর জায়গার পরিবর্তন হলে অনিদ্রা হতে পারে।

লক্ষণ: কিছু লক্ষণ বা উপসর্গের মাধ্যমে অনিদ্রা বা ইনসোমনিয়াকে চিহ্নিত করা যাই। সেগুলো হলো-

⭐ রাতে ঘুমাতে সমস্যা হওয়া।

⭐ ঘুমানোর সময় মস্তিস্ক কোনো একটা ঘটনা বা কাজের উপর ফোকাস করে থাকে  যার কারণে ঘুম আসে না।

⭐ বেশি রাত অবধি জেগে থাকার অভ্যাস করলে ঘুমাতে অসুবিধা হয়।

⭐ স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয় ও মেজাজ খিটখিটে হয়।

⭐ কোনো কিছু সম্পর্কে উদ্বিগ্নতা বেড়ে যাই।

⭐ মানসিকভাবে সবার সাথে মেলামেশা বন্ধ করে দেয়া।

প্রতিরোধ ও চিকিৎসা: অনিদ্রাকে নানাভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব। অনেকে এটার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে না জেনে থাকার কারণে এটিকে এড়িয়ে চলে।  কিন্তু অনিদ্রার মাধ্যমে নানা রকম সমস্যা হয়ে থাকে। ঘুম সম্পূর্ণ না হওয়ার কারণে শারীরিক নানারকম সমস্যা দেখা যাই তার মধ্যে শারীরিক স্থুলতা অন্যতম। এজন্য অনিদ্রা সমস্যাকে গুরুত্ব সহকারে নিয়ে কিছু উপায় মেনে চলার মাধ্যমে নিরাময় করা যাই। যেমন-

ব্যক্তিগত উদ্যোগ:

⭐ প্রতিদিন একই সময়ে ঘুম থেকে উঠার চেষ্টা করতে হবে।

⭐ অ্যালকোহল, নিকোটিন এবং ক্যাফিনের মতো উত্তেজনামূলক সব কিছু পরিহার করতে হবে।

⭐ ঘুমের সময় সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।

⭐ নিয়মিত ব্যায়াম করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

⭐ আপনার ঘুমের পরিবেশটি আরামদায়ক করে তুলতে হবে।

চিকিৎসা: অনিদ্রার জন্য জ্ঞানীয় আচরণগত থেরাপি (সিবিটি -১) আপনাকে জাগ্রত রাখে এমন নেতিবাচক চিন্তাভাবনা এবং ক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে বা অপসারণে সহায়তা করতে পারে এবং অনিদ্রাজনিত রোগীদের জন্য এটি সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসার একটি  হিসাবে সুপারিশ করা হয়। সাধারণত, সিবিটি -1 ঘুমের ওষুধের চেয়ে সমান বা আরও কার্যকর। এছাড়াও ডাক্তারের পরামর্শের মতো চলতে হবে।

বিভিন্ন গবেষণায় বিভিন্ন স্লিপার গ্রুপগুলির মধ্যে অনিদ্রার বিস্তার সম্পর্কে মিশ্র ফলাফল পাওয়া গেছে। কিছু রক্ষণশীল অনুমান দেখায় যে প্রাপ্ত বয়স্করা 10% থেকে 30%  দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রায় বাস করে। অন্যান্য গবেষণার জন্য, এই চিত্রটি 50% থেকে 60% এর কাছাকাছি। নির্দিষ্ট জনসংখ্যার গোষ্ঠীতেও অনিদ্রা বেশি দেখা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে যে অনিদ্রা 30% থেকে 48% প্রবীণ লোককে প্রভাবিত করে। এটি দীর্ঘস্থায়ী চিকিৎসা পরিস্থিতি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং নানা ধরণের ওষুধের উচ্চতর ব্যবহারের পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর ঘুমের অভ্যাস এবং স্ট্রেসের মতো কারণগুলির জন্য দায়ী হতে পারে যা সমস্ত বয়সের ক্ষেত্রে অনিদ্রা সৃষ্টি করে। অন্যান্য গবেষণায় দেখা গেছে যে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে 23.8% অবধি অনিদ্রা দেখা দিতে পারে। গর্ভবতী মহিলাদের 50% এরও বেশি  ঘুমের সমস্যাগুলি অনুভব করে যা অনিদ্রার লক্ষণও হতে পারে।

এজন্য আমাদের সবাইকে অনিদ্রার ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে, এটিকে কোনোভাবে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।  এটি তাৎক্ষণিক সমস্যা সৃষ্টি না করলেও এক সময় দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আশা করি উপরোক্ত তথ্যের মাধ্যমে আপনারা তা বুঝতে পেরেছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top