রসের ভাওয়াইয়া

ত্তরবঙ্গের প্রাণের গান ভাওয়াইয়া।খেটেখাওয়া মানুষের অন্তরের আকুতি,নারী বিরহ,নিত্যদিনের মনের ভাব, সমসাময়ীক বিষয় সবই প্রকাশ পায় এই ভাওয়াইয়া গানে। ভাওয়াইয়া গান মূলত বাংলাদেশের রংপুর অঞ্চলে এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার ও আসাম অঞ্চলে বেশি চর্চা করা হয়। অন্যান্য গানের মত ভাওয়াইয়ারও জনপ্রিয়তা কম নয়। উত্তরাঞ্চলে একসময় ভাওয়াইয়া গানের আসর বসতো প্রতিটা গ্রামে গ্রামে। শত শত বছর ধরে যে সব গুণী শিল্পী ভাওয়াইয়া গান লালন করে এসেছে তাদের মধ্যে ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাস উদ্দিন অন্যতম। আব্বাসউদ্দীনকে যেমন ভাওয়াইয়া সম্রাট বলা হয়। তেমনি কছিমউদ্দিনকে ভাওয়াইয়া যুবরাজ বলা হয়।

ভাওয়াইয়া হচ্ছে ভাবের গান। ভাব এর আঞ্চলিক শব্দ হচ্ছে ভাও। ভাওয়াইয়া শব্দটি যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে পাব ভাও-ইয়া। অর্থাৎ যে গানটি মানুষের মনের অনুভূতি অর্থাৎ মনের ভাব থেকে বেরিয়ে আসে সেটিই ভাওয়াইয়া গান। ভাওয়াইয়া গান একজন কথক এর সরাসরি মনের ভাব প্রকাশ করে। আমরা যদি একটু ভাওয়াইয়া গানটাকে দেখি। এমন কোন বিষয় নাই যা ভাওয়াইয়া গানএ উপস্থাপন করা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ,দেশ,বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ,ঋতু, পহেলা বৈশাখ,পিঠাপুলি,স্বামী স্ত্রীর কাহিনী, নদী ভাঙ্গার কাহিনী,অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার, সতর্কতামূলক বার্তা ও সমসাময়ীক বিষয় থেকে শুরু করে সকল বিষয় এ গানে ফুটে ওঠে।

ভাওয়াইয়ার পূর্বপুরুষদের কথা যদি চিন্তা করি, তাহলে প্রথমেই আমাদের মাথায় চলে আসবে ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাস উদ্দিনের কথা। সেসময় আব্বাস উদ্দিন বহু গান রেকর্ড করেছিলেন।আব্বাস উদ্দিনের পাশাপাশি আব্দুল আলিম অন্যতম। এই বিখ্যাত ব্যক্তিদের অসামান্য অবদানের ফলেই ভাওয়াইয়া গানটা আজও আমাদের মাঝে টিকে রয়েছে। তাছাড়া এসব গুণী শিল্পীদের পরে যদি আমরা চিন্তা করি তাহলে চলে আসবে, ভাওয়াইয়া যুবরাজ মোহাম্মদ কছিমউদ্দিনের কথা।শিল্পী আব্বাস উদ্দিন এর পরে তাকেই ভাওয়াইয়ার জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভাওয়াইয়া যুবরাজ মোহাম্মদ কছিম উদ্দিন প্রথমে পালা গানের দলে দোহার( কৌতুক অভিনেতা )হিসাবে যোগ দেন। তিনি এই চরিত্রে অল্প দিনেই অনেক সুনাম অর্জন করেন। তাছাড়া ভাওয়াইয়া গান রক্ষায় মোস্তফা জামান আব্বাসী,নুরুল ইসলাম জাহিদ,অনন্ত কুমার দেব, খন্দকার মোহাম্মদ আলী সম্রাট,নীল কমল মিত্র,এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান,ভূপতি ভূষণ বর্মা (নাম না-জানা আরো অনেকেই)এনাদের অবদান অতুলনীয়।

আমরা যদি একটু আগের কথা চিন্তা করি।সে সময়ে রংপুর বেতারে “তিস্তা পাড়ের গান” নামে একটা নিয়মিত অনুষ্ঠান হতো। এই অনুষ্ঠানে ভাওয়াইয়ার গুনী শিল্পীরা গান পরিবেশন করতো।”তিস্তা পাড়ের গান”শোনার জন্য সে সময়ে মানুষ কাজকর্ম ফেলে রেডিও ধরে বসতো।

ভাওয়াইয়া গান অনেক সময় বিজ্ঞানের কথাও বলে। এরকম যদি আমরা একটি গান দেখি,

“মোক মারিলু ভালেরে করিলু
ছাওয়াক মারিলুরে খাইতে
আটো করিয়া বিছিনারে পারিয়া
পাও ধরাইম তোক আইতৎ রে
সাংনা মারিলু ক্যানে”

( মোক মানে আমাকে, ছাওয়াক মানে সন্তানকে, বিছিনারে মানে বিছানাতে, পাও মানে পা,আইতত্ মানে রাতে )

এ গানটিতে,লোকসঙ্গীত ভাওয়াইয়ায় উত্তরবঙ্গের সমাজচিত্র ফুটে উঠেছে। একসময়ের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিলো খুবই ভঙ্গুর।এ গানের প্রথম কথায়,(মোক মারিলু ভালোরে করিলু ,ছাওয়াক মারিলুরে খাইতে) বলা হয়েছে, ব্রেস্ট ফিডিং মাদার ডে তে মা কে টর্চার করলে মা তার বাচ্চা দুধ দিতে পায়না। এই গানটি ষোল শতকের গান। ভাওয়াইয়া গানে, ষোল শতকেই প্রকাশিত হয়েছে যে ,ব্রেস্টফিডিং মাদার ডে তে মাকে টর্চার করলে সেই মা তার বাচ্চা কে দুধ দিতে পারেনা। এই একবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞান বলছে, এই মায়েরা মেন্টাল টর্চার পেলে তাদের প্রলাক্টিন নামক হরমোন সিক্রেশন হয়না। প্রলাক্টিন নামক হরমোন দুধ তৈরিতে সহায়তা করে। এই প্রলাক্টিন নামক হরমোন যদি সিক্রেশন হয়,তাহলে একটা মা তার বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে পরে ।যেটা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে । তাহলে এই ষোল শতকের খেটে খাওয়া নিরন্ন মানুষের ভাওয়াইয়া গান যেটা বলছে ,বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানও সেটা বলছে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশিষ্ট ভাওয়াইয়া শিল্পীরা ভাওয়াইয়া গান গেয়ে মুক্তিযুদ্ধাদের উৎসাহ দিতেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন ক্যাম্পে ক্যাম্পে ভাওয়াইয়া গানের আসর বসানো হতো এবং শিল্পীরা সংগীত পরিবেশনা করে মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ দিতেন। তাছাড়া বহু ভাওয়াইয়া শিল্পী মুক্তিযুদ্ধা ছিলেন।
এরকম যদি একটা গান লক্ষ করি,

” ওকি বাপরে বাপ মুক্তিফৌজ কি যুদ্ধ করে বাপরে”

এ গানটি ভাওয়াইয়া যুবরাজ মোহাম্মদ কছিম উদ্দিনের লেখা। এ গানে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধে অবাক হয়েছিলেন যে ,আমাদের অস্ত্র গোলাবারুদ কম থাকা সত্ত্বেও আমরা তাদেরকে প্রতিহত করতে পারছি। এরকম আরো অনেক গান দেখতে পাওয়া যায়।

ভাওয়াইয়া গান হতে পারে একজন নারী বিরহের কথা, হতে পারে একজন গাড়িয়ালের কথা, হতে পারে একজন মৈশাল এর কথা।
আমরা যদি একটা বিখ্যাত গান দেখি,

“ওকি গাড়িয়াল ভাই হাঁকাও গাড়ি তুই চিলমারীর বন্দরে”

গানটি আমাদের সকলেরই বেশ সুপরিচিত। শুধু গাড়িয়াল(যিনি গরুর গাড়ি চালান),মৈশাল(যিনি মহিষের গাড়ি চালান),হালুয়া(কৃষক),জালুয়া(জেলে)এর কথাই ভাওয়াইয়া গানের উঠে আসে না। প্রায় সব রকমের কথাই এখানে উঠে আসে। নবান্নের ভাওয়াইয়া গান আছে, পিঠাপুলির ভাওয়াইয়া গান আছে, মাছের ভাওয়াইয়া গান আছে, পাখির ভাওয়াইয়া গান আছে, পাত্রীর ভাওয়াইয়া গান আছে যেগুলো নানা রকম রং ঢং এ গাওয়া হয়। তাছাড়া ভাওয়ৈইয়া গানের কিছু বিশেষ তাল আছে।সে তাল গুলোহলো চটকা, ক্ষিরল,দরিয়া,দিঘলনাশা ইত্যাদি। ভাওয়াইয়া গানের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গলাভাঙ্গা। উত্তরবঙ্গ একসময় দরিদ্র পীড়িত অঞ্চল ছিল।গরুর গাড়িতে যখন গাড়িয়াল চড়ত তখন সেই গাড়িয়াল মনের সুরে গান হাকাত। সে সময়ে রাস্তা ছিল কাঁচা রাস্তা। ভাঙ্গা রাস্তায় যখন গাড়ির চাকা পড়তো তখন গাড়িয়ালের গলার সুর একটু বিকৃত হতো।আর এই বৈশিষ্ট্যটাই এ গানের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য।যা অন্য গানে একদমই দেখা যায় না।
ভাওয়াইয়া গান টা অন্যান্য গানের থেকে একদম আলাদা।এ গানে আঞ্চলিক ভাষার শব্দ ব্যবহার করা হয়। যেমনঃ মুই,তুই,তোমরা,হামরা ইত্যাদি। যদি একজন গায়ক ভাওয়াইয়া গান ভালোভাবে গাইতে পারে তাহলে সে অন্যান্য গানেও খুব তাড়াতাড়ি গাইতে পারবে।

আমার দৃষ্টিকোণে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করতে ভাওয়াইয়ার অবদান অতুলনীয়। কিন্তু আমাদের এই ভাওয়াইয়া সেরকমভাবে চর্চা হচ্ছে না।উত্তরবঙ্গে হাতে গোনা দুই একটি জেলায় চর্চা হলেও অন্যান্য জেলায় এটি চর্চা হচ্ছে না। আমাদের এ গান কে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন বিভিন্ন ভাওয়াইয়া সংগঠন। আমাদের প্রয়োজন শিল্পী তৈরি করা। আমাদের দরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে শিল্পীদের সহযোগিতা করা।যাতে এই ভাওয়াইয়ার ঐতিহ্যটা টিকে রয়। ভাওয়াইয়া গান যে শুধু উত্তরবঙ্গের তা কিন্তু নয় ভাওয়াইয়া গান আমাদের সকলের।এ গান কে টিকিয়ে রাখা আমাদের একান্ত কর্তব্য ও দায়িত্ব। আমাদের উচিত তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে বড়পর্যায় পর্যন্ত এ গান কে চর্চা করা এবং এ গানের শিল্পী তৈরি করা যাতে এ গানটি যুগ-যুগান্ত আমাদের মাঝে এটিকে রয়। এছাড়াও ভাওয়াইয়া চর্চার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে এবং এ গান রক্ষায় আমাদের সকলকে একসাথে কাজ করতে হবে।

1 thought on “রসের ভাওয়াইয়া”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top