ইলন মাস্ক

বর্তমান বিশ্বের অনেক তরুণ উদ্যোক্তাই স্বপ্ন দেখে ইলন মাস্ক হয়ে ওঠার। তাঁকে আদর্শ মেনে অনেকেই উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার স্বপ্ন দেখছে। আর তিনিও এমন একজন মানুষ যিনি স্বপ্ন দেখতে, স্বপ্নকে বাস্তবে পরিনত করতে, ও দেখাতে ও দারুন ভালবাসেন। তিনি এমন একজন মানুষ যিনি অনলাইনে লেনদেনকে আজকের অবস্থানে নিয়ে আসার সূত্রপাত করেছিলেন। আজকের বিশ্ববিখ্যাত পে-পাল, স্পেস এক্স, টেসলা তাঁরই অবদান। চলুন আজ আমরা ঘুরে আসি এই অসাধারন সফল মানুষটির সাফল্যের পথ ধরে।

ইলন মাস্কের জীবনীঃ

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় জন্ম নেয়া মার্কিন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী ইলন মাস্ক এর পুরো নাম ইলন রীভ মাস্ক। তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২৮শে জুন। ১৯৯৯ সালে এক্স ডট কম নামে তাঁর প্রতিষ্ঠিত অনলাইন ভিত্তিক অর্থ লেনদেনের মাধ্যমটিই বর্তমানে সারাবিশ্বে তুমুল জনপ্রিয় পেপাল। ২০০২ সালে তিনি স্পেস এক্স ও ২০০৩ সালে টেসলা মোটরস্ প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০২ সালে তিনি মার্কিন নাগরিকত্ব লাভ করেন। মাস্ক তাঁর জীবনের দ্বিতীয় দশকের শেষ দিকে কমপ্যাক্ট কম্পিউটার্সের একটি শাখার কাছে তাঁর প্রথম কোম্পানী “জিপ টু” বিক্রি করে প্রথমবারের মত মাল্টিমিলিয়ন এর খাতায় নাম লিখেন। ২০১২ সালের মে মাসে তিনি শিরোনামে উঠে আসেন যখন তাঁর কোম্পানী স্পেস এক্স প্রথমবারের মত আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্রে অর্থের বিনিময়ে ভ্রমন ইচ্ছুক যাত্রী প্রেরণ করে। ২০১৬ সালে সোলার সিটি কিনে নেয়ার মধ্যদিয়ে তিনি তাঁর অর্জনের পাল্লা আরও ভারী করেন এবং ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম দিকে একজন উপদেষ্টা হওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করার মাধ্যমে ব্যবসায়িক জগতের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান পাকা করেন।

শিক্ষাজীবনঃ

ছোটবেলায় বাবার সাথে আফ্রিকায় থাকাকালীন সেখানকার স্থানীয় একটি বেসরকারি স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯৮৯ সালে ১৭ বছর বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকার বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা পরিহার করে কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। মা কানাডিয়ান হওয়ার সুবাদে তিনিও সহজেই কানাডার নাগরিকত্ব পেয়ে যান। অতঃপর সেখান থেকে ১৯৯২ সালে আমেরিকায় পাড়ি জমান ইউনিভার্সিটি অব পেনসেলভেনিয়াতে ব্যবসা ও পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনার জন্য। অর্থনীতিতে প্রথম ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জন করার পর দ্বিতীয় ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জন করেন পদার্থবিজ্ঞানে। সেখান থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসেন এনার্জি ফিজিক্সে P.H.D ডিগ্রি অর্জনের জন্য। ঠিক সে সময়েই ইন্টারনেট বিপ্লবের সূচনা হয় এবং মাস্ক এর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে মাত্র দুই দিন পিএইচডি প্রোগ্রামে কাজ করার পর বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেন। তিনি নিজেও হয়তো জানতেন না সে সময় নেয়া এই কঠিন সিদ্ধান্ত একসময় তাঁর ব্যক্তি জীবন এবং বিশ্বকে বদলে দিতে পারে।

পেশা জীবনে সফলতাঃ

পেশাজীবনে মাস্ক একজন পরিশ্রমী বটে! যেখানে হাত দিচ্ছেন সফলতার মুখ না দেখা পর্যন্ত অদম্য পরিশ্রম করে চলেছেন। একের পর এক অবদান রেখে চলেছেন সমাজের নানা ক্ষেত্রে। চলুন জেনে নেওয়া যাক তার কিছু কোম্পানির কথা।

জিপ ২ঃ

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে ভাইয়ের সাথে মিলে ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর প্রথম কোম্পানি “জিপ ২”। জিপ ২ একটি অনলাইন ভিত্তিক সিটি গাইড। এটি মূলত ছিল পত্রিকা প্রকাশকদের জন্য যা ব্যবসায়িক দিক-নির্দেশনা এবং মানচিত্র প্রদান করত। ১৯৯৯ সালে কমপ্যাক কম্পিউটার্স নগদ ৩০৭ মিলিয়ন ডলার ও ৩৪ মিলিয়ন ডলারের স্টকের বিনিময়ে জিপ টু কিনে নেয়। এখানে ইলন মাস্ক প্রায় ২২ মিলিয়ন ডলার পায়। যা তিনি তাঁর পরবর্তী উদ্যোগের মূলধন হিসেবে ব্যবহার করেন।

পেপালঃ

১৯৯৯ সালে আরো কয়েকজন সহ নির্মাতার সঙ্গে (x.com) নামে একটি অনলাইন ভিত্তিক আর্থিক লেনদেন সেবাদাতা সাইট চালু করেন যা পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী পেপাল (paypal) হিসেবে পরিচিতি পায়। শুরুতে এই সেবাটি কেউ গ্রহণ করতে না চাইলেও বর্তমানে এটি ইন্টারনেট ভিত্তিক টাকা লেনদেনের সবচেয়ে বড় মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।২০০২ সালে পেপাল কে eBay প্রতিষ্ঠানটি কিনে নেয় প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে। বিক্রির পূর্বে মাস্ক পেপাল এর ১১ শতাংশ শেয়ারের মালিক থাকায় প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ডলার অর্জন করেন।

স্পেস এক্সঃ

২০০২ সালে মাস্ক তাঁর তৃতীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান “স্পেস এক্সপ্লোরেশন টেকনোলজি কপোরেশন” বা স্পেসএক্স (SpaceX)  এর যাত্রা শুরু করেন।এটি মূলত মহাকাশযান তৈরি এবং উৎক্ষেপণ বিষয়ক প্রতিষ্ঠান। স্পেসএক্স থেকে এমন রকেট তৈরি করা হয় যেগুলো প্রচলিত রকেটের চাইতে অনেকগুণ বেশী সস্তা কিন্তু কার্যকারিতার দিক দিয়ে এক নম্বরে অবস্থান করছে। স্পেসএক্সই একমাত্র ব্যক্তি মালিকাধীন কোম্পানি যেখান থেকে প্রথম কোন মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করা হয়। নাসার সাথেও স্পেসএক্সের চুক্তি হয় আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্রে মালামাল পৌঁছানো এবং নাসার নিজস্ব মহাকাশযানের বদলে স্পেসএক্স এর যানে মহাকাশচারী আনা নেয়ার ব্যাপারে। কারণ স্পেসএক্সের মহাকাশযানগুলো একাধিকবার ব্যবহারোপযোগী।

টেসলা মোটরসঃ

২০০৩ সালের জুলাইয়ের দিকে যাত্রা শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাণকারী কোম্পানি টেসলা মোটরস। গাড়ি প্রেমিকদের কাছে টেসলা এক পরিচিত নাম। যদিও  কোম্পানির শুরুতে মাস্ক ছিলেন না। ২০০৪ সালে তিনি এর চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করেন। মাস্ক টেসলাতে যোগদান করার পর কোম্পানিটি নতুন করে যাত্রা শুরু করে এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করে। প্রতিষ্ঠার মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় ২০০৮ সালে টেসলা স্পোর্টস কার এর একটি এডিশন ‘রোডস্টার’’ বাজারজাত করে। ২০১৬ তে মাস্ক tesla.com ডোমেইনটি একজন ব্যক্তির কাছ থেকে কিনে নেন যার কাছে ডোমেইন নেইমটি প্রায় ২৪ বছর ধরে ছিল। এছাড়াও এই কোম্পানি থেকে ইলেকট্রিক সিডান “Model-S”, ” মডেল ৩ সিডান” বাজারে আনা হয় যা গাড়ির জগতে রীতিমত জনপ্রিয় হয়ে গেছে। ২০১৯ সালে টেসলা সেমি নামে একটি ট্রাক প্রস্তুতের কাজ শুরু হবার কথা হয়েছিলো যা একবার ব্যাটারি ফুল চার্জ দিলে প্রায় ৫০০ মাইল পথ পাড়ি দিতে পারবে। উল্লেখ্য, টেসলা কোম্পানির নামকরণ করা হয় কিংবদন্তী বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলা নামানুসারে।

সোলারসিটিঃ

২০০৬ সালে ইলন এবং তাঁর দুই কাজিন মিলে গড়ে তোলেন সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সোলারসিটি। ২০১৬ সালে মাস্ক এটিকে সম্পূর্ণ টেসলার অধীনে নিয়ে আসেন। বর্তমানে দুই প্রতিষ্ঠানের সিংহভাগ শেয়ারই।

প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টাঃ

ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর যখন বিশাল অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিকল্পনা ঘোষণা দেন– মাস্ক নতুন প্রেসিডেন্ট ও তাঁর উপদেষ্টামন্ডলীর সাথে নিজের চিন্তার বেশ মিল খুঁজে পান। সে বছরের ডিসেম্বরেই ট্রাম্পের কৌশল ও নীতি বিষয়ক ফোরামে তাকে আহ্বান জানানো হয় এবং তার পরের জানুয়ারিতে তিনি ট্রাম্পের “ম্যানুফ্যাকচারিং জবস ইনিশিয়েটিভ “-এ যোগ দেন। বিতর্কিত ট্রাম্প প্রশাসনে তাঁর যুক্ত হওয়ার মূল লক্ষ ছিল মূলত সৌরশক্তি ব্যবহার করে পৃথিবীর যাত্রাকে গতিশীল করা আর এর ফলে লক্ষ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। তবে সেই বছরের ১ জুন ট্রাম্প প্যারিসে অনুষ্ঠিত পরিবেশ বিষয়ক সম্মেলন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাম প্রত্যাহার করার পর মাস্ক তাঁর উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়ান।

মাস্কের সম্মানজনক স্বীকৃতিঃ

তিনি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং ব্যবসার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য একাধিক পুরস্কার এবং স্বীকৃতি লাভ করেন।

২০১০ সালে মহাকাশে রেকর্ডের জন্য প্রাইমারি ওয়ার্ল্ড সংগঠন এর পক্ষ থেকে তিনি “ফেডারেশন এয়ারোনটিক ইন্টারন্যাশনাল “ এফএআই গোল্ড স্পেস পুরস্কার পান।

২০১৬ সালে পৃথিবীর সেরা ১০০ ধনী ব্যক্তির তালিকায় ৮৩ তম ধনী ব্যক্তি হিসেবে জায়গা করে নেন। ২০১৭ এর ফোর্বস এর ৪০০ ধনী ব্যক্তির তালিকায়  আমেরিকার ২১ তম ধনী হিসেবে জায়গা করে নেন।

ইলন মাস্কের জীবনী থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে “আয়রনম্যান” খ্যাত টনি স্টার্ক এর চরিত্র। ” আয়রনম্যান টু” এ ক্যামিও আছে মাস্কের এমনকি আয়রনম্যান টু ফিল্মটির কিছু অংশ তাঁর স্পেসএক্সের ভিতরে দৃশ্যায়িত হয়েছিলো ।

ইলন মাস্ক নিঃসন্দেহে এক অনুপ্রেরণার নাম। যিনি তাঁর মেধা এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উৎসর্গ করে মানবহিতৈষী কাজ করে চলেছেন। আউট অব দ্যা বক্স চিন্তা করাই যার সহজাত প্রবৃত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে৷

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top