মাল্টিভার্স বা বহু-মহাবিশ্ব

বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিষয়গুলোর ভিতর একটি হচ্ছে মাল্টিভার্স বা প্যারালাল ইউনিভার্সের ধারণা।মুলত মাল্টিভার্স বা বহু-মহাবিশ্ব হলো মহাবিশ্বগুলির প্রকল্পিত সম্ভাব্য সেট, যার মধ্যে, আমরা যে মহাবিশ্বে বসবাস করি সেটিও অন্তর্ভুক্ত। একত্রে এই মহাবিশ্বগুলি বিদ্যমান : এই স্থান, সময়, পদার্থ, শক্তি, এবং ভৌত নীতিগুলি এবং ধ্রুবকগুলি যেগুলি তাদের বর্ণনা করে, সবকিছু গঠন করে।

১৯৫৩ সালে ডাবলিনে এরভিন শ্রোডিঙ্গার একটি ভাষণ দিয়েছিলেন, যেখানে তিনি কৌতুকপূর্ণভাবে তাঁর শ্রোতাদের সতর্ক করেছিলেন এই বলে যে তিনি যা বলতে যাচ্ছেন তা হয়ত ‘উন্মাদের কথা বলে মনে হবে’। তিনি বলেছিলেন যে, যখন তার নোবেল সমীকরণগুলি বিভিন্ন ইতিহাস বর্ণনা করছে বলে মনে হচ্ছে, তখন এগুলি “বিকল্প নয়, কিন্তু সব সত্যিই একযোগে ঘটেছে”। এটিই মাল্টিভার্সের অলীক উপন্যাসের বাইরে সবচেয়ে পুরানো তথ্যসূত্র।

আমেরিকান দার্শনিক এবং মনোবিজ্ঞানী উইলিয়াম জেমস ১৮৯৫ সালে প্রথম “মাল্টিভার্স” উক্তিটি ব্যবহার করেন; যদিও তিনি একটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করেছিলেন।

অনন্ত মহাবিশ্বের বা মাল্টিভার্সের তত্ত্ব অনুযায়ী আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্ব একটি নয়, অসংখ্য। এই ধারণাটি বিগ ব্যাং তত্ত্বের পরবর্তী তাত্ত্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জগতে স্থান করে নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আমাদের মহাবিশ্ব যদি কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশনের মধ্য দিয়ে স্থান-কালের শূন্যতার ভিতর দিয়ে আবির্ভূত হয়ে থাকে, তবে এই পুরো প্রক্রিয়াটি কিন্তু একাধিকবার ঘটতে পারে, এবং হয়ত বাস্তবে ঘটেছেও। এই একাধিক মহাবিশ্বের অস্তিত্বের ব্যাপারটি প্রাথমিকভাবে এডোয়ার্ড ট্রিয়ন আর পরবর্তীকালে মূলতঃ আঁদ্রে লিন্ডে এবং আলেকজাণ্ডার ভিলেঙ্কিন-এর গবেষণা থেকে বেরিয়ে এসেছে। ধারণা করা হয় যে, ইনফ্লেশনের মাধ্যমে সম্প্রসারিত মহাজাগতিক বুদ্বুদ থেকে আমাদের মহাবিশ্বের মতই অসংখ্য মহাবিশ্ব তৈরী হয়েছে, যেগুলো একটা অপরটা থেকে সংস্পর্শবিহীন অবস্থায় দূরে সরে গেছে। এ ধরনের অসংখ্য মহাবিশ্বের একটিতেই হয়ত আমরা অবস্থান করছি অন্য গুলোর অস্তিত্ব সম্বন্ধে একেবারেই জ্ঞাত না হয়ে। স্ট্রিং তত্ত্বিকদের গণনা থেকে জানা গিয়েছে যে, ১০^৫০০টির মতো ভ্যাকুয়াম স্তরের তথা মহাবিশ্বের অস্তিত্ব থাকতে পারে । দীর্ঘদিন ধরে এই তত্ত্বকে যাচাইযোগ্যতা এবং পরীক্ষণযোগ্যতার অভাবে অভিযুক্ত করা হলেও সম্প্রতি অনন্ত মহাবিশ্বের কিছু পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে বলে দাবী করা হয়েছে।

প্যারালাল ইউনিভার্সের সবচেয়ে চমৎকার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় সম্ভবত কোয়ান্টাম ফিজিক্সে। যেহেতু কোয়ান্টাম ফিজিক্স যথেষ্ট দুর্বোধ্য রকমের গাণিতিক সম্ভাবনা-নির্ভর একটি ক্ষেত্র, তাই আমরা বোঝার সুবিধার্থে খুব ছোট একটি উদাহরণ নিয়ে আলোচনা করবো। এই তত্ত্বটি জম্বি-ক্যাট থিউরি নামেও পরিচিত।

মনে করুন, একটি বদ্ধ রুমে একটি ঘূর্ণায়মান ইলেকট্রন রাখা আছে। ইলেকট্রনটি স্পিন ডিটেক্টর একটি যন্ত্রের সাথে যুক্ত করা, যার শেষ প্রান্তে একটি হাতুড়ি যুক্ত আছে, যে হাতুড়ির সামনে রাখা বিষাক্ত গ্যাসভর্তি একটি কাচের টেস্টটিউব। ইলেকট্রনটি যদি ক্লক-ওয়াইজ স্পিন করে, তাহলে ডিটেক্টর যন্ত্রটি তা ডিটেক্ট করতে পারবে এবং হাতুড়ির আঘাতে টেস্টটিউবটি ভেঙে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়বে ও বিড়ালটি মারা যাবে। ইলেকট্রনটি এন্টি-ক্লকওয়াইজ ঘুরলে ডিটেক্টরে কোনো সংকেত পৌঁছাবে না, সুতরাং হাতুড়ি নড়বে না, টেস্টটউবটি অক্ষত থাকবে, ফলে বিড়ালটিও বেঁচে থাকবে। এখন, এক্ষেত্রে ঠিক কোন ঘটনাটি ঘটবে?

উত্তরটি একইসাথে খুবই সহজ এবং গোলমেলে। যদি ইলেকট্রনটি ক্লক-ওয়াইজ ঘুরে থাকে, তার মানে রুমটিতে একটি মৃত বিড়াল পড়ে আছে। যদি এর উল্টোটা হয়, অর্থাৎ ইলেকট্রনটি এন্টি ক্লক-ওয়াইজ ঘুরে থাকে, তবে সেক্ষেত্রে রুমটিতে একটি জীবিত বিড়াল আছে। কিন্তু আমরা যেহেতু বলেছি ইলেকট্রনটি একই সময়ে দুই দিকেই ঘুরছে, সুতরাং তত্ত্বমতে ঐ রুমে এখন এমন একটি বিড়াল রয়েছে যা একই সঙ্গে জীবিত ও মৃত! অর্থাৎ পরীক্ষণের ফলাফল অনুসারে ওই রুমটিতে এমন একটি বিড়াল রয়েছে, যা জীবিত না আবার মৃতও না! এ ধরনের সম্ভাবনার কারণে একে জম্বি-ক্যাট বলা হয়!

কোয়ান্টাম ফিজিক্সের এই অদ্ভুত নিয়মের কারণে গাণিতিকভাবে একই স্থানে ভিন্ন ভিন্ন একাধিক কিন্তু বিপরীত ঘটনা ঘটমান থাকার সম্ভাবনা থেকে যায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেউ যদি রুমের ভেতর লক্ষ্য করেন, তাহলে কি তিনি একইসাথে জীবিত ও মৃত বিড়াল দেখতে পাবেন? উত্তর হচ্ছে, না! অর্থাৎ একই পরীক্ষণের জন্য আমরা ভিন্ন ভিন্ন পর্যবেক্ষক রাখলে প্রত্যেকে শুধুমাত্র একটি ফলাফলই দেখতে পাবেন। একজন পরীক্ষক মৃত বিড়াল এবং একই সময়ে অন্য একজন পরীক্ষক ওই রুমটিতে জীবিত বিড়াল দেখতে পাবেন। এর মানে হচ্ছে, একই ঘটনা দুজন পর্যবেক্ষক দুভাবে দেখতে পাচ্ছেন, কিন্তু একে অন্যেরটা দেখতে পাচ্ছেন না। অর্থাৎ ঐ নির্দিষ্ট ঘটনার সাপেক্ষে তারা ভিন্ন দুটি সময় প্রত্যক্ষ করছেন, তাদের পর্যবেক্ষণ দুটি ভিন্ন সময়রেখায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। ঠিক যেভাবে সমান্তরাল দুটি রেখা পাশাপাশি অবস্থানে চলতে শুরু করলেও অসীম দূরত্বেও তাদের কখনও দেখা হবে না। অর্থাৎ, দুটি ভিন্ন বা বিপরীত ঘটনা একই সময়ে একই স্থানে ঘটার গাণিতিক এই সম্ভাবনা আমাদের প্যারালাল ইউনিভার্সের দিকেই ইঙ্গিত প্রদান করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top