Parallel Universe

আমরা অনেকেই গল্প বা সিনেমায় প্যারালাল ইউনিভার্স নিয়ে অনেক কথা শুনেছি। এখন প্যারালাল ইউনিভার্স এর অস্তিত্ব আসলেই আছে কিনা কিংবা এ নিয়ে বিজ্ঞান কী বলে তা জানতে হলে অবশ্যই পড়তে হবে এই লেখাটি।

 

প্যারালাল ইউনিভার্স:

 

আমরা তো অনেকেই প্যারালাল ইউনিভার্সের নাম শুনেছি, যাকে বাংলায় সমান্তরাল মহাবিশ্ব বলা হয়।

অর্থাৎ, প্যারালাল ইউনিভার্স বা সমান্তরাল বিশ্ব হচ্ছে এমন একটি তত্ত্ব যেখানে বলা হয়েছে মহাবিশ্বে একাধিক পৃথিবী রয়েছে এবং তারা একটি অন্যটির প্রতিরূপ।নির্দিষ্ট সংখ্যার প্যারালাল ইউনিভার্সকে মাল্টিভার্স বলা হয়।প্যারালাল ইউনিভার্স আমাদের ব্রহ্মাণ্ডের মতো আরও একটি বা একাধিক ব্রহ্মাণ্ড যা ঠিক আমাদেরই মতো। সেখানকার প্রকৃতি, ভূমণ্ডল এমনকি প্রাণিজগৎও একেবারে আমাদেরই মতো। আইনস্টাইনের বিগ ব্যাং থিওরির পর থেকেই প্যারালাল ইউনিভার্স সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের জানার আগ্রহ বেড়ে যায়।হতে পারে আপনি যেমন এই লেখাটি এই মুহূর্তে পড়ছেন ঠিক আরেকটি প্যারালাল ইউনিভার্স এ আপনার প্রতিরূপ আরেকজন আছে যে এই মুহূর্তে এই লেখাটিই পড়ছে এবং আপনারা দু’জনেই দু’জনের কথা ভাবছেন। প্যারালাল ইউনিভার্স নিয়ে ‘দ্য ওয়ান’ সিনেমাটিতে দেখানো হয় এক লোক পৃথিবীর সবগুলো প্যারালাল ইউনিভার্স এর গ্রহগুলোতে গিয়ে সেখান থেকে তার মত দেখতে মানুষগুলোকে মেরে ফেলছে।

 

প্যারালাল ইউনিভার্সের কারণে পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া কিছু কাহিনিঃ

 

প্যারালাল ইউনিভার্সে চলে যাওয়া নারীঃ

 

২০০৮ সালের ১৬ জুলাই লেরিনা গার্সিয়া গর্ডো নামের একজন স্প্যানিশ নারী একটি অনলাইন ফোরামে সাহায্যের জন্য পোস্ট করে বসেন। ৪১ বছর বয়সী এই নারী দাবী করেন যে, তিনি একটি প্যারালাল ইউনিভার্সে চলে এসেছেন। ঘুমানোর আগে তিনি যা যা দেখে ঘুমিয়েছিলেন তার অনেক কিছুই মিল নেই। সেগুলো যত ছোট ছোট ব্যাপারই হোক না কেন, তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে তিনি তার নিজের ইউনিভার্স এ নেই, চলে এসেছেন প্যারালাল একটি ইউনিভার্স এ।

 

 

রহস্যময় লোক:

 

১৯৫৪ সালে টোকিও শহরের হানেডা বিমানবন্দর এর একটি কর্মব্যস্ত দিন। সবকিছু বেশ স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। একটি ইউরোপিয়ান বিমান যাত্রীদের নামিয়ে দিলে কাহিনীর শুরু। যাত্রীরা কাস্টমস এ পৌঁছালে পরিপাটি পোশাক পরিহিত এক মধ্যবয়সী লোক কাস্টমস এর কর্মকর্তাদের জানালেন যে, তিনি ব্যবসার খাতিরে জাপানে এসেছেন। সে বছরে তিনি আরও দুইবার এসেছিলেন জাপানে। লোকটির প্রধান ভাষা ফরাসি হলেও তিনি জাপানিজ ভাষায় কথা বলছিলেন। এছাড়া তিনি আরও বেশ কয়েকটি ভাষা জানতেন। তার মানিব্যাগ এ থাকা বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশগুলোর মুদ্রা দেখে বোঝা যায় যে তিনি নিয়মিতই বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করেন। যখন তাকে তার দেশ কোথায় এটি জিজ্ঞেস করা হয় তখনই গোলমেলে ব্যাপারটি শুরু হয়। লোকটি বেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই উত্তর দিলেন তার দেশের নাম টরেড। এটি ফ্রান্স আর স্পেন এর সীমানা ঘেষে অবস্থিত। তার উত্তর শুনে কর্মকর্তারা নিজেদের মাঝে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। তারা লোকটিকে বললেন যে, টরেড নামের কোনো দেশ নেই। কর্মকর্তাদের কথা শুনে লোকটি তার পাসপোর্ট বের করে তাদেরকে দেখান। পাসপোর্টটি ইস্যু করা হয়েছে সেই টরেড দেশটি থেকে যেটির কোনো অস্তিত্বই নেই। এমনকি তার সেই পাসপোর্ট এ জাপান ও অন্যান্য দেশগুলোতে ব্যবসার জন্য যাতায়াতের ভিসা স্ট্যাম্প লাগানো। পাসপোর্ট এর এই ব্যাপারটি নিয়ে সেখানকার কর্মকর্তারা যারপরনাই অবাক হলেন। তারা লোকটির যে কোম্পানির সাথে সাক্ষাৎকার এর কথা সে কোম্পানির নাম আগে কখনও শোনেননি। লোকটি যে হোটেলে তার থাকার জন্য রুম রিজার্ভ করে রেখেছেন সে হোটেলে তার নামে কোনো রিজার্ভেশন নেই। এমনকি লোকটির কাছে থাকা চেকবুকে যে ব্যাংক এর নাম ছিল সেই নামেও কোনো ব্যাংক নেই। কাস্টমস এর কর্মকর্তাগণ তাকে একটি বিশ্ব মানচিত্র নিয়ে অ্যান্ডোরা দেশটি দেখালেন। তারা ভাবছিলেন লোকটি খুব সম্ভবত অ্যান্ডোরা থেকেই এসেছে এবং কোনোভাবে মজা করার চেষ্টা করছে। কিন্তু লোকটি মানচিত্রটি দেখে হতচকিত হয়ে যান। তিনি বলেন কয়েক হাজার বছর ধরে তার দেশ টরেড আছে সেখানে, অ্যান্ডোরা কী করে এলো। লোকটিকে সেই অবস্থাতেই কাস্টমস এর লোক পার্শ্ববর্তী হোটেল এর একটি রুমে সেই রাতের জন্য রাখা হলো। পরের দিন সকালে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। সারা রাত ধরে অভিবাসন কর্মকর্তাদের কড়া নজরদারি আর পাহারা থাকার পরেও লোকটি তার ঘরের ভিতর থেকে উধাও হয়ে যায়। ব্যাপারটি আরও ধোঁয়াশায় পরিপূর্ণ হয় যখন দেখা যায় যে, বিমানবন্দর এর নিরাপত্তা কক্ষ থেকে লোকটির ব্যক্তিগত কাগজপত্র, রহস্যময় দেশ টরেড থেকে ইস্যু করা পাসপোর্ট আর ড্রাইভিং লাইসেন্স উধাও হয়ে গেছে। পুলিশ আর বিমানবন্দরের কর্মকর্তাগণ লোকটিকে তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোথাও পাননি। শেষমেশ ব্যাপারটা এমন দাঁড়ালো যে, মনে হতে পারে এই ঘটনাটি কখনও ঘটেইনি। ঘটনাটিকে এখনও অনেকে প্যারালাল ইউনিভার্স এর কারণে ঘটেছে বলে মনে করে। প্যারালাল ইউনিভার্স এ শুধু একই দেখতে জায়গাই নয় বরং আমাদের মত দেখতেই মানুষ রয়েছে। এদেরকে ব্রায়ান গ্রিন তাঁর ‘দ্য হিডেন রিয়্যালিটি’ বই এ ‘ডপলগ্যাংগার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

 

প্যারালাল ইউনিভার্স নিয়ে তত্ত্ব:

 

এতদিন প্যারালাল ইউনিভার্সকে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী হিসেবে অনেকে চালিয়ে দিলেও সেটির দিন প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। সম্প্রতিকালে ‘ফিজিক্যাল রিভিউ এক্স’ জার্নালে প্রকাশিত কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর নতুন র‍্যাডিকেল থিওরিতে বলা হয় – অন্য ইউনিভার্স এর ব্যাপারগুলো সত্য এবং একটি বিশাল সংখ্যায় এই ইউনিভার্সগুলো রয়েছে। এই থিওরি আবিষ্কারক বিজ্ঞানীদের মতে, আমাদের পরিচিত যে ইউনিভার্স, তার ওপরে অন্যান্য সব ইউনিভার্স একটি সূক্ষ্ম বিকর্ষণ বল প্রয়োগ করে, আর এ কারনেই কোয়ান্টামের জগত এতো অদ্ভুত আর দুর্বোধ্য।

 

“Many interacting worlds” থিওরি এর অন্যতম এই প্রবক্তা বলেন, “আমাদের এই ব্যাখ্যাটি হচ্ছে, আমাদের ইউনিভার্স এর আশেপাশে আরও অনেক প্যারালাল ইউনিভার্স রয়েছে যেগুলোর প্রত্যেকের মাঝে একটি সূক্ষ্ম সংযোগ বিদ্যমান।” এই থিওরিটি ১৯৫০ সালের কোয়ান্টাম মেকানিক্স থিওরি “Many world interpretation”এর সস্পর্কিত। ওয়াইজম্যান একটি লিখিত বক্তব্যে বলেন “Many worlds interpretation” অনুযায়ী প্রতি বার একটি কোয়ান্টাম পরিমাপ করার ফলে একটি ইউনিভার্স থেকে আরও অনেকগুলো শাখা ইউনিভার্স তৈরি হয়। ফলে সমস্ত রকমের সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হয়। এমনও কোনো একটি ইউনিভার্সের অস্তিত্ব থাকবে, যেখানে ডায়নোসর বিলুপ্তকারী গ্রহাণু পৃথিবী ঘেঁষে অন্য কোথাও চলে গেছে। কোনো এক ইউনিভার্স এ হয়ত অস্ট্রেলিয়াকে পর্তুগাল দখল করে রেখেছে। তবে যেহেতু এই ইউনিভার্সগুলো আমাদের ইউনিভার্সকে প্রভাবিত করে না, তাই সমালোচকেরা এসব নতুন ইউনিভার্সের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আর এখানেই আলাদা আমাদের

“Many worlds interacting” থিওরি। এই থিওরির প্রবক্তাদের মতে, মলিকুলার ডাইনামিক্সের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এই থিওরি যেটি কিনা রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই থিওরি যদি সত্যি হয় তাহলে মানুষ কখনো অন্য ইউনিভার্সের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে কিনা – এই প্রশ্নের উত্তরে ওয়াইজম্যান বলেন, এমন সম্ভাবনা তাদের থিওরির মাঝে অন্তর্ভুক্ত নয় বটে, কিন্তু তা এখন আর নিছক কল্পনা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

 

প্যারালাল ইউনিভার্স নিয়ে যেমন বিভিন্ন তত্ত্ব হাজির করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে, তেমনি এর বিপরীতে অনেক যুক্তি দাঁড় করিয়ে দেখানো হয়েছে মতবিরোধ। আমরা জানিনা, আমাদের ইউনিভার্স এর বাইরে আসলেই আরও একটি বা কয়েকটি কিংবা শতশত পৃথিবী আছে কিনা।

 

 

 

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top