বর্ণান্ধতা(Colour blindness)

কালার ব্লাইন্ডনেস হলো চোখের দৃষ্টিশক্তির এমন একটি অবস্থা যখন আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিক আলোতে বিশেষ কিছু রঙের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পান না। নীল, সবুজ, হলুদ বা লাল রং আলাদা করে চেনা কিংবা এইসব রঙের সংমিশ্রণ রয়েছে এমন রং দেখে বুঝতে পারা তাঁদের জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। মূল রংটি আসলে কি সেটি বুঝতেই তাঁদের হিমশিম খেতে হয় আবার মজার ব্যাপার হলো অনেকে বুঝতেই পারেন না যে তাঁরা ভুল রং দেখছেন ! মেডিকেল সায়েন্সের ভাষায় এইসব মানুষই কালার ব্লাইন্ড। এই ব্যাপারটির অন্য একটি নামও আছে আর তা হোল “কালার ভিশন ডেফিসিয়েন্সি” (CVD)।

এটা খুবই প্রচলিত এবং প্রতি ১২ জন পুরুষের মধ্যে ১ জনের ও প্রতি ২০০ জন্য মহিলার মধ্যে ১ জনের হয়। সারা বিশ্বে বর্ণান্ধতায় আক্রান্ত মানুষের আসল সংখ্যা হল প্রায় ৩০০ মিলিয়ান। আমাদের বন্ধু বা আত্মীয়দের মধ্যে এই সমস্যায় আক্রান্ত হবার সম্ভবনা আছেই। 

অধিকাংশক্ষেত্রে, ফটো-পিগমেন্টের উৎপাদন ও সংবেদনশীলতাকে প্রভাবিত করা জিনগত অসঙ্গতির কারণে এটা হয়। বর্ণান্ধতাকে তিনভাগে ভাগ করা হয়। ফটো-পিগমেন্টের ত্রুটির প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে এই বিভাজন। 

১. রেড-গ্রিন বর্ণান্ধতাঃ বর্ণান্ধতার এটা সবথেকে প্রচলিত রকম, যা প্রধানত লাল ও সবুজ কোণ ফটো-পিগমেন্টের যথাযথ কার্যকলাপের অভাব থেকে হয়। এই রকমের বর্ণান্ধতাকে নিম্নলিখিত আরও ভাগে ভাগ করা হয়ঃ

  • প্রোটানোমালি (লাল কোণ পিগমেন্টের অস্বাভাবিকতা থেকে হয়। লাল, হলুদ ও কমলা রঙ সবুজ লাগে)।
  • প্রোটানোপিয়া (লাল কোণ পিগমেন্টের কার্যকলাপের ক্ষতি থেকে হয়। লাল রঙ কালো, হলুদ, সবুজ ও কমলা রঙের লাগে)।
  • ডিউটেরানোমালি (সবুজ কোণ পিগমেন্টের অস্বাভাবিকতা থেকে হয়। হলুদ ও সবুজ রঙ লাল বলে মনে হয়)।
  • ডিউটেরানোপিয়া (সবুজ কোণ পিগমেন্টের কার্যকলাপের ক্ষতি থেকে হয় এবং লাল রঙ বাদামী হলদেটে ও সবুজ রঙ ধোঁয়াটে পশমি লাগে)। 

২. ব্লু-ইয়েলো বর্ণান্ধতাঃ এই বিরল ধরণের বর্ণান্ধতা নীল ফটো-পিগমেন্টের সঠিক কার্যকলাপের অভাবের জন্য হয়। এটাকে নিম্নলিখিত ভাগে ভাগ করা যায়ঃ

  • ট্রিটানোমালি (নীল কোণ পিগমেন্টের কাজ নষ্ট হবার জন্য হয়। নীল রঙ সবুজ দেখতে লাগে এবং হলুদ, লাল ও বাদামী রঙের তফাৎ বুঝতে পারা যায় না)।
  • ট্রিটানোপিয়া (নীল কোণ পিগমেন্টের অভাবের জন্য হয়। নীল রঙ সবুজ দেখতে লাগে এবং হলুদ রঙ ধূসর ও বেগুনী মনে হয়)। 

৩. সম্পূর্ন বর্ণান্ধতাঃ এটা বর্ণান্ধতার বিরল ধরণ, যেখানে যেকোণ ধরণের রঙ চিনতে পারে না। এটা স্বাভাবিক দৃষ্টি শক্তির ক্ষেত্রেও হস্তক্ষেপ করে। এটা নিম্নলিখিত ভাগে ভাগ করা যায়ঃ 

  • কোণ মনোক্রোমাসি (বহুবিধ কোণ পিগমেন্টের যথাযথ কার্যকলাপের অভাবের ফলে হয় এবং লাল, সবুজ ও নীল সেল মনোক্রোমাসি হতে পারে)।
  • রড মনোক্রোমাসি (বর্ণান্ধতার বিরল থেকে বিরল ধরণ, যা যেকোণ ধরণের কোণ ফটো পিগমেন্টের অভাব থেকে হয়। ভুক্তভোগীরা শুধুই সাদা, কালো ও ধূসর রঙ বুঝতে পারে)।

 

বর্ণান্ধতার সবথেকে লক্ষণীয় কারণ হল কোণ ফটো পিগমেন্টের অনুপস্থিতি বা অস্বাভাবিকতা। বর্নান্ধতার ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত কারণের জন্য এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ঃ

১. জিনগত কারণ (অধিকাংশ ক্ষেত্রে বর্ণান্ধতা বংশগত। বাবা-মায়ের থেকে অনেকসময়ে লাল-সবুজ বর্ণান্ধতা রঙের অভাব প্রাপ্ত হয়। 

২. নির্দিষ্ট কিছু রোগ (সিকেল সেল অ্যানিমিয়া, ডায়াবেটিস, অ্যালজাইমারস, গ্লূকোমা, পারকিসন্স রোগ ও লিউকোমিয়ার মতন কিছু নির্দিষ্ট স্বাভাবিক কোণ-পিগমেন্টকে ধ্বংস করে দেয় ও সমস্যার কারণ হয়)।

৩. সুনির্দিষ্ট কিছু ওষুধের ব্যবহার (হৃৎপিণ্ডের সমস্যা, অধিক রক্তচাপ, ইরেক্টাইল ডিসফাংশান, সংক্রমণ, স্নায়বিক গোলমাল ও মানসিক সমস্যায় ব্যবহৃত নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ স্বাভাবিক কোণ-পিগমেন্টকে ধ্বংস করে দেয় ও সমস্যার কারণ হয়)।

৪. বয়স (বয়স বাড়লে স্বাভাবিক কোণ পিগমেন্ট নষ্ট হয়ে যায় ও সমস্যা মাথাচাড়া দেয়)।

৫. রাসায়নিক (কার্বন ডাইসালফাইড সহ নির্দিষ্ট কিছু ক্ষতিকারন রাসায়নিকের সংস্পর্শ বর্ণান্ধতার জন্য দায়ী প্রধান কারণ)।  

আজ অবধি, বর্ণান্ধতার সেইঅর্থে নির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা নেই। বংশগত বর্ণান্ধতার নিরাময় করা যায় না। অবশ্য, ওষুধের ব্যবহার অথবা অন্তনির্হিত কোন কারণের জন্য হলে সেই কারণ দূর করলে রোগ কিছুটা সারে। কালার ফিল্টার গ্লাস ও কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার করলে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত সাহায্য করলেও সম্পূর্ন নিরাময় সম্ভবপর নয়। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top