“একটুখানি সহানুভূতি “

সমাজে বসবাস করতে গেলে আমাদের বিভিন্ন শ্রেনী ও পেশার মানুষের সাথে বসবাস করতে হয়।সমাজে ধনী ও মধ্যবিত্ত,নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের বসবাস।তবে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের সংখ্যা বেশি। সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে যাদের আর্থিক অবস্থা এতটা শোচনীয় যে, খেয়ে পড়ে বেচে থাকার সামর্থ্য ও নেই তাদের। অনেকে আছেন যারা বয়সের ভারে বৃদ্ধ হওয়ার কারণে পরিবারের সদস্যরা ঠিকমতো খুঁজ খবর নেয় না। অন্যদিকে এমনও আছেন, যারা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।সুতরাং অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেকে বৃদ্ধ বয়সে জীবিকার পিছনে ছুটে চলেন শুধুমাত্র নিজের ও নিজের পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরনের জন্য।

তারা এই বয়সে এসেও নিজের এতটুকু আত্নসম্মান বজায় রাখেন যে,কারো কাছে হাত না পেতে নিজেই নিজের ভাগ্যের সাথে সংগ্রাম করে যান।মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যুবক বয়স থেকে পরিশ্রম শুরু করে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করে যান কোথাও যেন তাদের ক্লান্তি ভর করতে পারে না,,আত্নসম্মানের জায়গাটা তারা ততটুকু বজায় রাখতে জানেন।যে ক্লান্তিবোধ তাদের আত্নসম্মান নষ্ট করে দিতে পারে এমন ক্লান্তিবোধ তারা কখনো দেখান না। আমরা অনেক সময় বিভিন্ন রেলওয়ে স্টেশন,বাস স্টেশন ফূটপাতের দেখি অনেক বৃদ্ধলোক বিভিন্ন টুকিটাকি জিনিসপত্র বিক্রি করেন। বিভিন্ন ধরনের ফলমূল, বাদাম,চানাচুর, রকমারী পিঠা, কাচামালের ব্যবসা বা ভ্যানের মধ্যে কাপড় বা জুতা বিক্রি করেন।

তাদের অল্প পুজির জিনিসপত্র আমাদের অনেকের হয়তো পছন্দ হবে না।তবে আমাদের প্রয়োজনে না আসলেও মানবিক দিক বিবেচনা করে তাদের কাছ থেকে এসব জিনিস কেনা উচিত।

কারণ  যে বয়সে তাদের বিশ্রাম নিয়ে একটু সুখে শান্তিতে থাকা ছিলো ঠিক   সেই মুহুর্তে জীবনের প্রয়োজনে তারা কঠিন বাস্তবতার শিকার।

সাধারণত তারা সবাইকে অনেক ভদ্রভাবে সম্মোধন  করেন। মা আপনার এটা লাগবে, বাবা আপনার এটা লাগবে এমনভাবেই সম্মেধন করেন।যাত্রীদের অনেকেই এসবে খুব বিরক্ত হন এবং আড়চোখে তাকান তাদের  দিকে। কেন জানি কেই খুব একটা সহানুভূতি তাদের প্রতি দেখাতে পারেন না!

এমনও হয় যে আমরা অনেক বিলাসবহুল জিনিস কিনে অনেক টাকা নষ্ট করি কিন্তু অল্প কয়টা টাকা দিয়ে তাদের কাছ থেকে কিছু কেনার ইচ্ছা পোষণ করি না। সুপার শপে গিয়ে নির্দিষ্ট করা দাম দিয়ে দামী দামী জিনিস কিনি, রেস্টুরেন্টে গিয়ে খেয়ে ওয়েটারকে অনেক টাকা উপহার দিয়ে নিজের বড়বড় ভাব নিতে পারি কিন্তু এই বাস্তবতার  শিকার মানুষগুলোর বেলায় আমাদের যত লাভ- ক্ষতির হিসাব।আমাদের বিবেক আজ কোথায় আমরা নিজেরাও হয়তো জানি না।

তবে মানবিক দিক বিবেচনা করে অপ্রয়োজনীয় হলেও তাদের কাছ থেকে সামান্য কিছু হলেও আমাদের কেনা উচিত।

তাদের কাছ থেকে কিছু কিনলে এক সাথে দুটি হবে।

প্রথমত,তাদের জীবীকা অর্জন সহজ ও কষ্ট কম হবে। কারণ কেউ কিনতে চায় না বলে ঘন্টার পর ঘন্টা তাদের জিনিস গুলো নিয়ে বসে থাকতে হয়। দ্বিতীয়ত , যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কাজ না করে বড় বড় কথা বলে বেড়ায় তাদের কিছুটা হলেও টনক নড়বে।  কেউ ভিক্ষাবৃত্তি বা চৌর্যবৃত্তিতে উৎসাহিত হবে না বরং কাজ করতে অনুপ্রেরণা পাবে।অন্যদিকে তারাও উৎসাহিত হয়ে সন্তুষ্টির সাথে তাদের কাজ করতে পারবে। তারা যে বাস্তবতার শিকার হয়ে এই কাজগুলো করছে ক্ষনিকের জন্য হলেও ভূলে যাবে তারা।

বয়সের ভারে ক্লান্ত হয়েও যারা নিজের এতটুকু আত্নসম্মান রেখে চলেন যে অন্যের কাছে যাতে হাত  না পেতে, নিজের অস্তিত্বের সাথে নিত্যদিন লড়াই করে জীবন যুদ্ধে সাহসী সৈনিকের মতো শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত লড়ে যান,তাদের কথা চিন্তা করলেই শ্রদ্ধায় বুক ভরে যায় ও মাথা নিচু হয়ে আসে৷ যুগে যুগে তাদের মতো মানুষই সভ্যতাকে দিয়েছে নতুন গতি।তাদের জন্য শ্রদ্ধাবোধ ও সম্মান মন থেকেই চলে আসে।

তাই আমরা চাইলেই আমাদের সবার ক্ষুদ্র প্র‍য়াসে একটা পরিবারের মুখে হাসি ফুটাতে পারি। নিতান্ত অল্প দামের জিনিসপত্রই তারা বিক্রি করে থাকেন।সুতরাং তাদের কাছ থেকে সামান্য কিছু কিনলে আমাদের আহামরী কোন ক্ষতি হবে না। আমরা আমাদের প্রেস্টিজ ও গৌরব বাড়ানোর জন্য অপ্রয়োজনে খরচ না করে সামান্য কিছু জিনিস তাদের কাছ থেকে কিনে একজন বয়োজৈষ্ট ব্যক্তি ও  তার পরিবারের মুখে হাসি ফুটাতে  পারলে সেটা আমাদের জন্য কম কি!!

একটুখানি সহানুভূতির পরশ বিতরণ হোক এসব সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য।

সানজিদা ইয়াসমিন লিজা

আইন বিভাগ, ২য় বর্ষ,কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top