বিতর্ক সম্পর্কিত কিছু তথ্য

আমরা অনেকেই বিতর্ক নিয়ে কম-বেশি ধারণা রাখি। একটি নির্ধারিত বিষয়ের পক্ষে-বিপক্ষে নিজের যুক্তি উপস্থাপনের মাধ্যমে নিজের বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করাই বিতর্কের মূল উদ্দেশ্য।

বিতর্ক কী?

বিতর্ক হচ্ছে যুক্তি-তর্কের খেলা। বিতর্কের মাধ্যমে যুক্তির আয়নার নিজের ভাবনাগুলোকে প্রতিফলিত করা যায়। এর ফলে বাড়ে চিন্তার পরিধি, জ্ঞান আর প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান।

অতএব, যুক্তি, তথ্য, তত্ত্বের সমন্বয়ে সত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক যে বিশেষ বাদানুবাদ উপস্থাপিত হয়, তা–ই বিতর্ক (Debate)। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতে, বিতর্ক যেন একটি অভিযান, তার পদে পদে নব নব আবিষ্কার, নতুনতর অভিজ্ঞান।

বিতর্কের উৎপত্তি?

গবেষকদের মতে, বিতর্ক হলো একটি প্রাচীনতম শিল্প। ধারণা করা হয় খৃষ্টপূর্ব ৪৮৯ বছর আগে প্রাচীন গ্রীসের সোফিস্ট (Sophist) সম্প্রদায়ের মাধ্যমে বিতর্কের প্রকাশ। সোফিস্ট প্রোটাগোরাস এর মাধ্যমে বিতর্কের গোড়াপত্তন  এবং মহামতি দার্শনিক সক্রেটিসের মাধ্যমে বিতর্ক জনপ্রিয়তা এবং প্রায়োগিকতা ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে।

বিতার্কিক কী?

যিনি বিরোধী দলকে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা করে যৌক্তিক গঠনমূলক ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বিতর্ক করেন।

বিতর্কের প্রকারভেদ?? 

বিতর্ককে বিভিন্নভাবে চর্চা করা হয়। এই চর্চার মাধ্যমে বক্তা সপক্ষের বক্তব্য যুক্তিযুক্তভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। চেষ্টা করে নিজের মতামতের ভিত্তিতে সত্য প্রতিষ্ঠার।

বিতর্কের কিছু প্রকারভেদ নিচে দেওয়া হলোঃ

১.সংসদীয় বিতর্ক ২.সনাতনী বিতর্ক ৩. ব্রিটিশ পার্লামেন্টরি বিতর্ক ৪. বারোয়ারি বিতর্ক ৫.জাতিসংঘ মডেল বিতর্ক ৬.ওয়ার্ল্ড ফরম্যাট ৭.প্ল্যানচেট বিতর্ক ৮.কাব্য বিতর্ক ৯.রম্য বিতর্ক ১০.টি ফরম্যাট ১১.ওয়ার্ল্ড ফরম্যাট।

বর্তমানে দেশে জনপ্রিয় কিছু বিতর্ক ধারার বর্ণনাঃ

সনাতনী বিতর্কঃ

বিতর্কের বেশ প্রাচীনকালীন এ ফরম্যাটটি বর্তমানে খুব একটি প্রচলিত না থাকলেও বাংলাদেশের বিভিন্ন স্কুল পর্যায়ের বিতর্কগুলো এখনো সনাতনী পদ্ধতিতে করা হয়ে থাকে। এখানে একটি নির্ধারিত বিষয়ের উপর পক্ষ দলের ও বিপক্ষ দলের তিনজন বক্তা (১ম বক্তা, ২য় বক্তা ও দলনেতা) পালাক্রমে নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন। সনাতনী বিতর্কে সাধারণত প্রত্যেক বক্তা তার বক্তব্য উপস্থাপনের জন্যে পাঁচ মিনিট ও গঠনমূলক পর্বের বক্তব্য শেষে উভয় পক্ষের দলনেতারা যুক্তিখন্ডনের জন্যে অতিরিক্ত তিন মিনিট করে সময় পেয়ে থাকেন। সনাতনী বিতর্ক পরিচালনার দায়িত্বে যিনি থাকেন তাকে ‘সভাপতি’ বা ‘মডারেটর’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়ে থাকে।

সংসদীয় বিতর্কঃ

সংসদীয় বিতর্ক বর্তমানে সবচেয়ে প্রচলিত বিতর্কধারা। বর্তমান সময়ে প্রতিযোগিতামূলক বিতর্কের ক্ষেত্রে সংসদীয় বিতর্কের ব্যবহার সর্বাধিক হারে দেখা যায়। পউভয় পক্ষের বক্তাদের (প্রধানমন্ত্রী/বিরোধীদলীয় নেতা, মন্ত্রী/উপনেতা, সংসদ সদস্য) প্রত্যেকে এখানেও পাঁচ মিনিট করে সময় পান তাদের বক্তব্য উপস্থাপনের জন্যে, কিন্তু এই পাঁচ মিনিট সময়ের মাঝে কৌশলগতভাবে প্রতিপক্ষ দল পয়েন্ট অফ ইনফরমেশন, পয়েন্ট অফ অর্ডার বা পয়েন্ট অফ প্রিভিলেজের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে আঘাত হানার পাশাপাশি নিজেদের জন্যে সুবিধা আদায় করে নিতে পারেন। গঠনমূলক পর্ব শেষে যুক্তিখন্ডন পর্বে প্রথমে বিরোধীদলীয় নেতা ও সর্বশেষে প্রধানমন্ত্রী তিন মিনিট করে অতিরিক্ত সময় পেয়ে থাকেন। ফরম্যাটের নামই যেহেতু সংসদীয় বিতর্ক, সুতরাং স্বাভাভিকভাবেই পুরো বিতর্কটি যিনি পরিচালনা করবেন তাকে ‘স্পিকার’ হিসেবে সম্বোধন করা হবে।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি বিতর্ক:

এ বিতর্কটি বেশ জটিল ধরনের। মূলত ইংরেজি বিতর্কের ক্ষেত্রে এ ফরম্যাটটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে বিধায় আমাদের দেশে এ ফরম্যাটের সাথে অনেকেই পরিচিত না। তবে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইংরেজি বিতর্কের ক্ষেত্রে নিয়মিত এই বিতর্কের চর্চা হয়। এ ফরম্যাটটি মূলত ব্রিটেনের সংসদীয় পদ্ধতির অনুসরণে করা। সুতরাং, মোট চারটি দল নিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি বিতর্ক হয়ে থাকে। চারটি দল হচ্ছে সরকারদলীয় উচ্চকক্ষ, বিরোধীদলীয় উচ্চকক্ষ, সরকারদলীয় নিম্নকক্ষ ও বিরোধীদলীয় নিম্নকক্ষ। ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি বিতর্কের ক্ষেত্রে বক্তারা সাধারণত সাত মিনিট করে সময় পান বক্তব্য দেয়ার জন্যে। তবে এ বিতর্কে কোনো ধরনের যুক্তিখন্ডনের জন্য আলাদা সময় বরাদ্দ থাকে না বিধায় নির্ধারিত সাত মিনিটের মাঝেই বক্তাদেরকে যুক্তিখন্ডনও দিতে হয়।

বিতর্ক চলাকালীন কিছু লক্ষণীয় বিষয়ঃ

১. তথ্যসমৃদ্ধ বক্তব্য প্রেরণ।

২. নির্ধারিত বিষয়কে সাধারণভাবে না দেখে একটু যুক্তিগত ভাবে দেখা।

৩. স্ক্রিপ্ট দেখে বলা থেকে বিরত থাকা।

৪. দলের স্ট্যান্ড পয়েন্ট (Standpoint) ধরে রাখা।

৫. সময়ের প্রতি লক্ষ রাখা।

৬.  সংসদীয় বিধি ও আচারণের প্রতি লক্ষ রাখা।

৭. অসংযত আচরণ থেকে বিরত থাকা।

৮. শ্রোতা, বিচারক, স্পিকার ও বিপরীত দলের প্রতি নজর (eye contact) রাখা।

৯. সাউন্ড সিস্টেমের প্রতি নজর রাখা অর্থাৎ মাইক্রোফোনের উপযুক্ত ব্যবহার করা।

বিতর্কে ভালো হয়ে ওঠার কিছু টিপসঃ

১. বিতর্ক করতে হলে প্রয়োজন তথ্যবহুল যুক্তি। প্রতিপক্ষের যুক্তি ঘায়েল করে বিচারকদের আকৃষ্ট করার জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন বিষয়ে ঠিকঠাক যুক্তি তথ্য প্রদান। আর সেজন্য প্রয়োজন বিষয়বস্তুর ওপর জ্ঞান থাকা।  সুতরাং, পত্র-পত্রিকা পড়া, প্রচুর বই পড়া এবং আপডেটেড থাকলে যেকোনো বিতর্কের যেকোনো বিষয় নিয়ে সহজেই পাঁচ মিনিট কথা বলা যাবে।

২. বিতর্কের পূর্বেই একটি নির্ধারিত বিষয় দেয়া থাকে।অনেক সময় বিতর্ক শুরুর মাত্র ১৫ মিনিট আগেও দেয়া হয়। সুতরাং, স্বল্প সময়ের মাঝে পুরো বিতর্কটি ধরতে পারা এবং নিজের দলের অবস্থান প্রতিপক্ষ থেকে দৃঢ় করার জন্য বিতর্কের বিষয়ের সঠিক ব্যবচ্ছেদ অত্যাবশ্যক।

৩. বিষয় হোক যা-তা, উপস্থাপনা হোক ভালো। সুন্দরভাবে কথা বলতে জানলে সবাই আকৃষ্ট হবেই! উপস্থাপনা বলতে আপনার অভিব্যক্তি, কন্ঠের জোর ও আত্মবিশ্বাসকে বোঝানো হয়েছে।যুক্তিতর্কের সময় বক্তার উপস্থাপনা ও বচনভঙ্গি যেন সাবলীল ও জোরালো হয়। এবং একটি ছোট কাগজে মূল পয়েন্টগুলো লিখে সেটি হাতে রেখে কথা বলা যেতে পারে। কিন্তু পুরো সময়জুড়ে স্ক্রিপ্ট দেখে কথা বলা, কথার মাঝে আটকে যাওয়া, এই জিনিসগুলো উপস্থাপনার সৌন্দর্যকে নষ্ট করে দেয়।

৪. প্রচুর পরিমাণে বিতর্ক দেখতে হবে। ভালো বিতার্কিকেরা কীভাবে বিতর্ক করেন, তাদের কৌশলগুলো কী এসব না দেখলে শেখা যায় না। এবং ইন্টারনেটে বসেই দেখে নিতে পারেন বিভিন্ন বিতর্কের অনুষ্ঠান। এতে আপনার চর্চা ভালো হবে।

বিতর্ক জিনিসটা খুব একটা কঠিন কিন্তু না।তাই আজ থেকেই বিতর্কের চর্চা শুরু করে দেন। হয়তো আগামীর দিনে আপনিই একজন সেরা বিতার্কিক হয়ে ওঠবেন।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top