কোহিনুর হীরা

কোহিনুর হীরা:


কোহিনুর হীরা। পৃথিবীজুড়ে বহুল আলোচিত একটি হীরা। কোহিনুরের সাথে গেঁথে আছে নানা মিথ, বিশ্বাস ও গল্প। কেউ কেউ ভাবেন এ হীরাটি ভীষণভাবে অভিশপ্ত। এটি ডিম্বাকৃতির শ্বেত হীরা। বর্তমান ওজন ১০৫ ক্যারেট (২১.৬ গ্রাম) বা ৩১৯ রতি। প্রাথমিকভাবে ওজন ছিল ৭৫৬ ক্যারেট। রাসি রত্ন ব্যবসায়ী তাভারনিয়ার যাচাই করে দেখেন, তার ওজন ২৬৮ ক্যারেটের সামান্য বেশি। ভেনিসের হীরক কর্তনকারী হরটেনসিও জর্জিস প্রথম অদক্ষ হাতে এ হীরা কেটে ফেলেন। এত বড় সর্বনাশ করায় সম্রাট শাহজাহান তাকে ১০ হাজার রুপি জরিমানা করেন। কোহিনুর কখনো ক্রয়-বিক্রয় করা হয়নি। এতে ৩৩টি পার্শ্ব রয়েছে।

কোহিনুর হীরার অর্থ ও নামকরনঃ ১৭৩৯ সালে ইরানের বাদশা নাদির শাহ ভারত আক্রমন করলে কর্নালের যুদ্ধে মুঘলদের পরাজয় ঘটে এবং মুঘল বাদশাদের যাবতীয় রত্ন ভান্ডার লুট করে নিয়ে যায়।নাদির শাহের লুট করা রত্ন সামগ্রীর মধ্যে একটি বড় মাপের দুর্লভ হীরা বাদশা নাদির শাহের দৃষ্টি আকর্ষণ করে যার জন্য নাদির শাহ হীরাটির উপর মোহিত হয়ে যায়।নাদির শাহের রত্ন ভাণ্ডারে এর আগে এত বড় চমকদার কোনো রত্ন ছিল না যা নাদির শাহের রত্ন ভান্ডারকে আলোকিত করে তুলছিল।নাদির শাহ হীরাটিকে দেখে এতটাই সম্মোহিত ছিলেন যে সর্বদা হীরাটিকে হাতের তলায় নিয়ে এসে দেখতে থাকতেন এবং একদিন হীরা টিকে দেখতে দেখতে নাদির শাহের মুখ দিয়েহীরাটি সম্পর্কে একটি কথা বার হয়ে আসে,কথাটি হল- কোহি-ই-নুর। ইরানিতে পার্সি ভাষার শব্দ কোহি যার অর্থ হল পাহাড় এবং নুর শব্দের অর্থ হল আলো। কোহি এবং নুর দুটি শব্দ মিলিয়েঅর্থ দাঁড়ায় পাহাড় ভেদ করে বেরিয়ে আসা আলো। এর আগে কোহিনুর হীরার আলাদা করে নির্দিষ্ট কোনো নাম ছিল না। নাদির শাহের দেওয়া নামের পর থেকে হীরাটি কোহিনুর নামে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করে।

ইতিহাস:


মূল ইতিহাস ও যাত্রাপথ কোহিনুর হীরার ইতিহাস (Kohinoor Diamond History) নিয়ে লোক মুখে অনেক কাহিনী শোনা যায়। পৌরাণিক মতে কোহিনুর হীরার ইতিহাসে পৌরাণিক যোগ পাওয়া যায়।আজ থেকে প্রায় ৫,০০০ বছর আগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সময় থেকে কোহিনুর হীরার অস্তিত্ব ছিল,তখন কোহিনুর হীরার নাম ছিল শ্রীমন্ত হীরা যদিও এই তত্বের ঐতিহাসিক কোনো প্রমান মেলেনি।আনুমানিক ১৩,০০০ হাজার খ্রিস্টাব্দ পূর্বাব্দে অন্ধ্রপ্রদেশের গুন্টার কাছে গোলকুণ্ডা হীরের খনি থেকে কোহিনুর হীরাটি পাওয়া যায়। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখলেদেখতে পাওয়া যায়,গোলকুন্ডা হীরের খনি থেকে যে সমস্ত হীরা গুলি পাওয়া গেছে সেই সমস্ত হীরা গুলির বেশির ভাগই বিদেশে কোনো কোনো সংগ্রহশালায়,সংগ্রহশালার শোভা বাড়াচ্ছে।প্রাচীন কালের অন্যান্য হীরার খনির মধ্যে গোলকুন্ডা ছিল অন্যতম বড় একটা হীরের খনি,যদিও পরে ব্রাজিলে এর থেকে বড় হীরার খনির সন্ধান পাওয়া যায়।গোলকুণ্ডার খাদান থেকে পাওয়া কোহিনুর হীরার ওজন ছিল ৭৯৩ ক্যারেট,এটাই ছিল পৃথিবীর সবথেকে বড় আকারের হীরা। এর আগে এত বড় হীরা কোথাও পাওয়া যায় নি।তবে প্রথম থেকেই কোহিনুর হীরার নাম কোহিনুর ছিল না,কোহিনুর হীরাকে আর পাঁচটি অন্য হীরা থেকে একটু বড় আকারের হীরা বলেই সবাই জানত।পরে কোহিনুর হীরা এক হাত থেকে অন্য হাতে হাতবদল হয়েছে।

মূল্য:


কোহিনুর হীরার দাম নির্ধারণ করা এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়ে ওঠেনি কারণ এখনো কোহিনুর হীরা কারো কাছে বিক্রি করা হয়নি।কোহিনুর শুধু এক হাত থেকে অন্য হাতে হস্তান্তর হয়েছে যুদ্ধের বিনিময়ে অথবা যৌতুকের মাধ্যমে। মুঘল সম্রাট আকবর তার আত্মজীবনী বাবর নামায় কোহিনুর হীরার উল্লেখ করেছেন।তখন পর্যন্ত মুঘল রাজকোষে কোহিনুর হীরা একটি সামান্য হীরাই ছিল,আলাদা করে কোহিনুর বিশেষ কোনো তকমা তখনো পায়নি।বাবরের পুত্র হুমায়ন তার বাবার কাছে কোহিনুরের মূল্য জিজ্ঞাসা করে ? তখন সম্রাট বাবর হুমায়ন কে বলে কোহিনুর হীরার বিনিময়ে যদি আরো অন্যান্য রত্নের সঙ্গে মূল্যাঙ্কন করা যায়তবে কোহিনুরের মূল্য দিয়ে বর্তমান পৃথিবীর সমস্ত মানুষের মুখে দুই দিনের অন্ন তুলে দেওয়া যেতে পারে। মুঘল রত্ন ভান্ডার লুঠ করে কোহিনুর হীরা নাদির শাহের হাতে পৌঁছালেনাদির শাহের বেগম কোহিনুরের মূল্য কত নাদির শাহের কাছে জানতে চান ? নাদির শাহ তখন বলেন আমার রাজ্যের ০৫ জন সবথেকে বলবান পুরুষকে ডেকেযদি তাদের হাতে ঢিল দিয়ে,পূর্ব,পশ্চিম,উত্তর,দক্ষিণ চার দিশায় এবং একজনকে আকাশের উপর দিকে ঢিল ছুড়তে দেওয়া হয়,তারপর তাদের ঢিল এই ০৫ দিকে যতটা দূর পর্যন্ত যাবেততটা দূর পর্যন্ত চারিদিক সোনা,রুপো এবং আরো অন্যান্য মূল্যবান রত্ন দিয়ে পাহাড় সমান করে দিলেও হয়তো কোহিনুরের সমতুলি মূল্য জোটানো যাবেনা।আজথেকে ৫০-৬০ বছর আগে চীনের হংকং এ একটি হীরার প্রদর্শনী হয়,সেখানে দেশ বিদেশের বিভিন্ন দামি সব হীরার নিলামী হচ্ছিল।সেই প্রদর্শনীতে গ্রাফ পিঙ্ক নামের ২৪.৭৮ ক্যারেটের একটি হীরা ছিল,সেই হীরাটি ঐ পদর্শনীতে বিক্রি হয় ৪৬ মিলিয়ন ড্রলারে।বর্তমানে কোহিনুর ইংল্যান্ডের মহারানীর মুকুটের শোভা বাড়াচ্ছে। কোহিনুরের বর্তমান ওজন হল ১০৫ ক্যারেট যা আগের তুলনায় অনেকটা কম হয়ে গেছে।হং কং এর হীরার প্রদর্শনীতে বিক্রি হওয়া হীরার মূল্যের সঙ্গে তুলনা করে,কোহিনুর হীরার মূল্য নির্ধারণ করলে কোহিনুরের আনুমানিক মূল্য হয়ে যায় ১,৫০০০ হাজার কোটি টাকা।

অভিশপ্ত কেন:


হীরারঅভিশাপ নিয়ে মিথ রয়েছে বহু বছর ধরে। কোহিনুর ছাড়াও হোপ ডায়মন্ড নিয়েও অভিশাপের গল্প প্রচলিত রয়েছে। হীরার অভিশাপগুলোর মূলে রয়েছে ইতিহাস। যে এই হীরা পেয়েছে সেই হারিয়েছে জীবন, সাম্রাজ্য। কোহিনুর হীরা নিয়ে কথিত আছে, এটিও কোনো হিন্দু দেবীর মন্দিরে খচিত ছিল। সম্রাট বাবরের স্বত্বাধিকারী ছিলেন। সিংহাসন থেকে বারংবার বিচ্যুত হয়েছেন তিনি। এরপর ছিল সম্রাট শাহজাহানের কাছে। ময়ূর সিংহাসনে বসিয়েছিলেন তিনি হীরাটি। ছেলে আওরঙ্গজেবের হাতে সিংহাসনচ্যুত হন তিনি। ভিয়েতনামে হীরাটি কেটে ছোট করা হয়।এরপর অনেক শাসকের কাছে যায় হীরাটি এবং প্রত্যেকেরই পরিণতি হয় করুণ। সিংহাসন নিয়ে রক্তারক্তি, খুন হয় প্রায় সব রাজ পরিবারেই। ১৮৫০ সালে হীরাটি ইন্ডিয়া থেকে চুরি করে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্রিটেনের রাজ পরিবারকে উপহার দেয় এটি। হীরাটির অদ্ভুত বিষয় খেয়াল করা হয় তখন। তা হলো এটির অভিশাপ শুধু পুরুষদের বেলায় কাজ করে! ব্রিটিশ যে রাজাই এটা পরেছেন তারা সবাই তাদের ক্ষমতা হারিয়েছেন। তাই অবশেষে এর স্থান হয় রানী এলিজাবেথের মুকুটে। ১৮৬ ক্যারেটের হীরাটি এখন মুকুটের অংশ হিসেবে লন্ডন টাওয়ারে প্রদর্শিত হচ্ছে নিয়মিত। এই অভিশাপের ঘটনা তারপর থেকেই বাজারে ছড়িয়ে পড়ে এবং থিতু হয়। সামান্য রত্ন পাথর বলে একে এড়িয়ে যাওয়া হয় না। হীরার মতো মহামূল্যবান রত্ন পাথরের বেলাতেও সেই অভিশাপের কথা খাটে। ইতিহাস তাই বলে, কোহিনুর হীরার অভিশাপ পুরুষ শাসকদের জন্যই।

ব্রিটিশদের হাতে কোহিনুর হীরা কীভাবে পৌঁছাল:


কোহিনুর হীরা রাজা রণজিৎ সিংহের দখলে এলে তিনি খুব বেশিদিন কোহিনুরকে নিজের ভোগ দখলে রাখতে পারেন নি। কোহিনুর হীরা দখলে আসার পর থেকে রাজা রণজিৎ সিংহেরশারীরিক অবস্থার অবন্নতি হতে শুরু করে। একসময় রাজা রণজিৎ সিংহের সেনা বাহিনীকে ইংরেজরা পর্যন্ত লৌহ দেওয়ালের সাথে তুলনা করতো,সেই রণজিৎ সিংহের অসুস্থতার সুযোগ নিয়েইংরেজরা রণজিৎ সিংহকে হারিয়ে দিয়ে ক্ষমতা দখল করে নেয়। অপরদিকে রাজা রণজিৎ সিংহের একমাত্র পুত্র বয়সে নাবালক হওয়ায় ব্রিটিশরা অনায়াসে রাজকোষ লুঠ করে চলে যায়।কারণ অনেক আগে থেকেই ব্রিটিশরা কোহিনুর হীরার ইতিহাস (Kohinoor Diamond History) শুনে আসছিল তাই তারা এতো দামি একটি রত্নকে নিজেদের কাছ থেকে হাত ছাড়া করতে চাননি।১৩৯৬ সালে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নর লর্ড ডালহৌসি রাজা রণজিৎ সিংহের ১৩ বছরের নাবালক পুত্রকে সঙ্গে করে কোহিনুর হীরাকে নিয়ে ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।ইংল্যান্ডে রাজা রণজিৎ সিংহের পুত্রের হাত দিয়ে হীরাটিকে রানী ভিক্টরিয়ার হাতে তুলে দেওয়া হয়। রানী ভিক্টরিয়ার কোহিনুর হীরার ডিজাইন পছন্দ হয়না।তাই তিনি হীরাটিকে পালিশ এবং নতুন করে নক্সা করার জন্য ডাচ নামের একজন জহুরিকে নিয়োগ করেন। টানা ৪০ দিনের চেষ্টায় কোহিনুরকে নতুন করে আকার দিয়েরানী ভিক্টরিয়ার মুকুটে বসানো হয়। কোহিনুরকে পালিশ করার পর কোহিনুর আরও চিত্ত আকর্ষক হয়ে ওঠে। কিন্তু হীরাটিকে নতুন করে রিডিজাইন করায়কোহিনুর হীরার ওজন ১৮৬ ক্যারেট থেকে কমে ১০৫ ক্যারেট হয়ে যায়। মহারানী ভিক্টরিয়া কোহিনুর হীরার ইতিহাস (Kohinoor Diamond History) এবং অভিশপ্ত হওয়ারকথা আগে থেকেই শুনে আসছিলেন। তাই তিনি কোহিনুর হীরার ইতিহাস (Kohinoor Dimond History) ও অভিশপ্ততার কথা মাথায় রেখে কোহিনুর হীরাকে নিয়ে একটি লিখিত দলিল করে যান।রানী ভিক্টরিয়া তার দলিলে লিখে যান ইংল্যান্ডের রাজ সিংহাসনে তার অবর্তমানে যিনি বসবেন এবং কোহিনুর হীরার উত্তরিধিকারী হবেন তাদের মধ্যে কোনো পুরুষ যেনকোহিনুরকে তার ব্যক্তিগত স্বার্থে নিজে ব্যবহার না করে। কোহিনুর হীরা বসানো মুকুটটি যেন সর্বদা তাদের রানীদের মাথাতেই পরানো হয়,আর আজও ইংল্যান্ডের রাজারা ভিক্টরিয়ার এই দলিল ফলো করে আসছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top