ছোটগল্প

ছোট প্রাণ ,ছোট ব্যথা ছোট ছোট দুঃখ কথা

নিতান্তই সহজ সরল

সহস্র বিস্মৃতি রাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি

তারি দুচারিটি অশ্রুজল।

নাহি বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘনঘটা

নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ

অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি মনে হবে

শেষ হয়ে হইল না শেষ।

ছোটগল্পের জনক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছোটগল্পের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এই উক্তিটি করেছিলেন। ছোটগল্পে কখনোই কোনো কাহিনীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বলা হয় না। শুধু কাহিনীর যেকোনো একটি অংশেরই বর্ণনা তুলে ধরা হয়।

‘শেষ হয়ে হইলো না শেষ’ আসলেই ছোট গল্পের জন্য সার্থক। ছোটগল্পের কখনোই কোনো শেষ হয় না। লেখক হয়তো তার গল্প লিখা শেষ করেছে কিন্তু তিনি তার পাঠকদের মনে জাগিয়ে দিয়ে গেছেন এক প্রশ্ন। এক অতৃপ্ত বাসনা। গল্পের পরে কি হলো তা জানার আকাঙ্ক্ষা।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে ছোটগল্প এমন হতে হবে যে ” শেষ হইয়াও হইল না শেষ ” অর্থাৎ গল্প শেষ হয়ে গেলেও যাতে রেশ থেকে যায় ।

বাংলা সাহিত্যে যে কয়টি শাখা রয়েছে তার মধ্যে ছোটগল্প সবচেয়ে কনিষ্ঠ। এর বয়স কতইবা হবে! দেড় কি দুইশ বছর। এর অনুপ্রেরণা এসেছে পাশ্চাত্য সাহিত্যের থেকে।

গল্পগুচ্ছ  নামীয় গ্রন্থে সংকলিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে সকল ছোটগল্প সংকলিত সেগুলো বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প হিসাবে অদ্যাবধি চিহ্নিত এবং বহুল পঠিত। বাংলা ছোটগল্পের সার্থক স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ। তার ‘ঘাটের কথা’ ছোটগল্পটি বাংলাভাষার প্রথম সার্থক ছোটগল্পের স্বীকৃতি পেয়েছে। অতঃপর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বনফুল, (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়), বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, সুবোধ ঘোষ, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, আশাপূর্ণা দেবী, জগদীশ গুপ্ত, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, মনোজ বসু হুমায়ূন আহমেদ প্রমুখের রচনানৈপুণ্যে বাংলা ছোটগল্প নতুন দিগন্তে প্রবেশ করেছে।

বাংলা সাহিত্যের নবীনতম সংরূপগুলির মধ্যে অন্যতম হল ছোটগল্প। যদিও সভ্যতার শুরু থেকে মানুষ গল্প শুনছে ও বলছে। যুগে যুগে বিচিত্র গল্প সৃষ্টি হয়েছে, তারপর তা ছড়িয়ে গেছে। কিন্তু ছোটগল্প এই সংরূপটি বিশেষভাবে একালের সৃষ্টি। তাই ‘গল্প’ এর সঙ্গে ‘ছোটগল্প’ এর একটি বিশেষ পার্থক্য আছে। এ শুধু কাহিনী বলা নয়, শুধু আখ্যান রচনা নয়, শুধু চরিত্র সৃষ্টিও নয়। এ এক বিশিষ্ট সাহিত্যরূপ।

সাধারণ ধারণা, ছোটগল্পকে ছোট হতে হবে এবং গল্পও হতে হবে। কিন্তু আকৃতিতে ছোট হলেই ছোটগল্প হয় না। উপন্যাসকে ছোট আয়তনে শিল্পরূপ দিলেও ছোটগল্প হয় না। ব্যপ্ত জীবনের খণ্ড মুহূর্ত, একটি অভিজ্ঞতা, কিংবা অভিজ্ঞতার আলোকে চয়িত কোনো উপলব্ধি ছোটগল্পের বিষয় হয়ে উঠতে পারে। আধুনিক ছোটগল্পের বিষয়বস্তুও বিচিত্র, তার উপস্থাপনাও বিচিত্র। কখনো কোনো তুচ্ছ ঘটনা, একটি চরিত্র, একটি ভাবনা, কোনো গভীর ইঙ্গিত নিয়েই ছোটগল্প এখন বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে। কখনো আকারে বড় হয়েও ছোটগল্প সার্থক শিল্পস্বীকৃতি লাভ করেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সমারসেট মম, মপাসাঁ কিংবা গোগোলের কলমে। হাডসন ছোটগল্পের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেছেন –

“A short story must contain one and only informing idea—”
ব্যানডার ম্যাথুজ তাঁর The philosophy of the short story গ্রন্থে ছোটগল্প সম্পর্কে লিখছেন –

“A short-story deals with a single character a single event, a single emotion or a series of emotions called forth by a single situation”

বৈশিষ্ট্যঃ
১। সংহত পরিধীতে বাহুল্য বর্জিতভাবে মানুষের জীবন সম্বন্ধে কোন একটি কেন্দ্রীয় বিষয়ের উপর আলোকপাত করাই ছোটগল্পের প্রধান লক্ষণ।

২। ছোটগল্প জীবনের খণ্ডাংশকে উদ্ভাসিত করে তোলে। রবীন্দ্রনাথ এজন্য বলেছেন –

ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা ছোট ছোট দুঃখ কথা
নিতান্তই সহজ সরল।
৩। আয়তনের দিক থেকে ও বহিরঙ্গ বিচারে ছোটগল্প ‘A slice of life’ এর কাহিনী রূপ। ক্ষুদ্রায়তন হলেও জীবন জিজ্ঞাসার পূর্ণতর রূপ ছোটগল্পে থাকবে। তবে –

‘সাঙ্গ করি মনে হবে / শেষ হয়েও হইল না শেষ।’
৪। ছোটগল্পে একটিমাত্র মহামুহূর্ত বা চরমক্ষণ থাকবে। গল্পের সমগ্র উৎকণ্ঠা তার উপরেই নিবদ্ধ থাকবে।

৫। ছোটগল্পে একটিমাত্র বস্তুকেই একমুখীভাবে পাওয়া যাবে, পার্শ্ব উপকরণগুলি সে একমুখিনতার আনুকূল্য করবে – অন্তরায় ঘটাবে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top