কুরু(The laughing sickness)

হাসি খুব ই স্বাভাবিক একটি বিষয়। কিন্তু হাসতে হাসতে কোনো মানুষের মৃত্যু হওয়া নিতান্তই একটি অস্বাভাবিক ব্যাপার। আর হাসতে হাসতে মারা যাওয়াই কুরু বা the laughing sickness রোগের মূল লক্ষণ।

দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের একটি দ্বীপরাষ্ট্র পাপুয়া নিউগিনিতে ফোর জনগোষ্ঠীর ভিতর প্রথম এ রোগের সন্ধান পাওয়া যায়।এই জনগোষ্ঠীর মানুষরা প্রায় এ অন্য গোষ্ঠীর মানুষদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতো।প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর সাথে যুদ্ধে শত্রুপক্ষের যারা মারা যেত কিংবা যুদ্ধে বন্দী হতো তাদের ভাগ্য ছিল বিজেতা পক্ষের খাদ্যে রূপান্তরিত হওয়া! মৃত মানুষের মস্তিষ্কের প্রতি সবচেয়ে বেশি লোভ ছিল এই ফোর জাতির লোকজনের! এমনকি নিজেদের আত্মীয়স্বজন কেউ মারা গেলে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার এক পর্বে মৃতদেহের মস্তিষ্কও খেয়ে ফেলত এরা! এটাই ছিল তাদের মৃতের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন!

এর পেছনে অবশ্য কারণ ছিল একটি। তাদের বিশ্বাস ছিল, মৃত মানুষের মস্তিষ্ক খেয়ে ফেললে মৃতের জীবনীশক্তিও তাদের দেহে চলে আসবে! তবে পুরুষেরা এটি প্রায়ই এড়িয়ে যেতো। কেননা শত্রুপক্ষের জীবনীশক্তি নিজের ভেতর প্রবেশ করলে একটি সমস্যা হতে পারে! মৃতের নিজের পক্ষের লোকজনের সাথে যুদ্ধ করার সময় হয়তো এটি তাদের দুর্বল করে ফেলতে পারে! অন্যদিকে নারীরা সন্তান জন্ম দেয়। এবং বাচ্চাদের দীর্ঘকাল বেঁচে থাকা দরকার। তাই মৃতদেহের মস্তিষ্ক ভক্ষণের সুযোগ পেতো নারী আর বাচ্চারাই।

তবে এই হিংস্র আর ভয়ানক মানুষেরা কিন্তু অদৃষ্টের এক নির্মম পরিহাসের শিকার হয়েছিলো যার নাম কুরু।

এই রোগের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১৯১০ সালের দিকে। যদিও প্রথম এটি মানুষের সামনে আসে আরো চল্লিশ বছর পরে, ১৯৫০ সালে। একজন অস্ট্রেলিয়ান অফিসার যখন পাপুয়া নিউগিনির ‘ইস্টার্ন হাইল্যান্ড’ প্রদেশে তার নিয়মিত তদারকিতে ছিলেন, তিনি এই রোগের কথা রিপোর্ট করেন। ১৯৫১ সালে আর্থার ক্যারি সর্বপ্রথম কুরু শব্দটি ব্যবহার করেন। এটি এসেছে ফোর ভাষার শব্দ কুরিয়া (Kuria) থেকে যার অর্থ ঝাঁকানো। কারণ কুরু রোগে আক্রান্ত মানুষের দেহ অনবরত কাঁপতে থাকে। এটিকে ‘লাফিং সিকনেস’ নাম দেওয়া হয় তার অদ্ভুত প্রাণঘাতী এই হাসির কারণে।

১৯৫৩ সালে পেট্রোল অফিসার জন ম্যাকআর্থার এই রোগকে নিজে পর্যবেক্ষণ করেন এবং একটি বিস্তারিত বিবরণ পেশ করেন। তিনি ধারণা করেন যে, এটি একটি সাইকোলজিক্যাল ব্যাপার ছাড়া আর কিছুই নয়।অবশেষে ভাইরোলজিস্ট ড্যানিয়েল কারলেটন গজডুসেক এবং ডাক্তার ভিনসেন্ট জিগাস দুজনে গবেষণা শুরু করলেন। এই রোগের রোগতত্ত্ব বা প্যাথলজি বোঝার জন্য গজডুসেক পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু করলেন।

কুরু রোগে আক্রান্ত মানুষের মস্তিষ্ক শিম্পাঞ্জীদের খেতে দেওয়া হল! এবং তাদের প্রতিটি কার্যকলাপ খাতায় লিপিবদ্ধ করা হল। দু’বছরের মাথায় শিম্পাঞ্জীদের একটির দেহে কুরু রোগের লক্ষণ দেখা দিলো। অবশেষে কুরু রোগের কারণ কী তা জানা গেলো। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হিসেবে ধরা হয়। এই আবিষ্কার ড্যানিয়েল কারলেটন গজডুসেককে ১৯৭৬ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার এনে দেয়।

পরবর্তীতে এই রোগ নিয়ে আরো গবেষণা হয়। আধুনিক গবেষণায় আবিষ্কৃত হয় ভাইরাস থেকেও আরো সরল গঠনের এক রোগ সৃষ্টিকারী অণু, যার নাম প্রিয়ন। ক্রোয়েটজফেল্ট-জ্যাকব রোগ, স্ক্রাপি, ম্যাডকাউ আর কুরু এই রোগগুলোর পেছনে এই একই জিনিস দায়ী- প্রিয়ন

আক্রান্ত জীবের মস্তিষ্ককে এটি ঝাঁঝরা করে ফেলে বলে এজন্য প্রিয়ন দ্বারা সৃষ্ট রোগের সমষ্টিগত নাম ‘সংক্রামক স্পঞ্জের ন্যায় এনসেফালোপ্যাথি’ বা transmissible spongiform encephalopathies (TSEs)। কুরু এই রোগগোষ্ঠীর এক ভয়ংকর সদস্য যা কালো থাবা মেলেছিল নিউগিনির এক অসহায় জনগোষ্ঠীর উপরে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top