পৌরাণিক কাহিনী বা মিথ(Myth)

এক দেশে এক রাজা ছিল। রাজার এক বিশাল রাজত্ব ছিল। চারদিকে ছিল তার জয় জয়কার। কিন্তু রাজার এই বিশাল সাম্রাজ্যে একদিন হানা দিল দস্যুদল………..

বলা হয় যে ,শ্রী কৃষ্ণ ছোট ছিলেন, তখন তিনি মাটি খেতে ভালোবাসতেন৷ একদিন তাঁর মা যশোধা তাঁকে ধরে ফেলেন৷ ‘নাটখট’ গোপাল তখন মাকে মিথ্যা কথা বলেন যে তিনি মাটি খাচ্ছেন না৷ মা যশোধা যখন গোপালকে মুখ খুলতে বলেন, তখন যশোধা দেখেন যে পুরো মহাবিশ্ব প্রভু শ্রী কৃষ্ণের মুখের ভিতর দেখতে পান৷

এরকম গল্প-কাহিনী শুনতে আমরা কেউ কখনোই বিরক্ত হইনা। আমাদের মধ্যে সবসময় একটা কৌতুহল কাজ করে যে এরপর কি হলো। এরকম রাজা-বাদশা বা শ্রীকৃষ্ণ-রামায়ণ এর মত পৌরাণিক কাহিনী শুনতে যে কারোরই ভালো লাগে। কিন্তু এই সব পৌরাণিক কাহিনী সম্পর্কে আমরা কে কতটুকুই বা জানি।

পৌরাণিক কাহিনী

পুরাণ বা পৌরাণিক কাহিনি হল সমাজে প্রচলিত লোক কাহিনির একটা প্রাচীন প্রকারভেদ। এসব কাহিনীকে ইংরেজিতে মিথ( myth) বলেও আমরা জানি। এর ভিত্তি হলো মানব সভ্যতা উদ্ভবের পূর্বে ঐশ্বরিক জগতে সংঘটিত হওয়া নানা রকম কল্পকাহিনী।সাধারণত বিশ্বজগৎ, পৃথিবী, প্রকৃতি ও মানব সভ্যতা ইত্যাদির উৎপত্তি ও স্বভাব ব্যাখ্যা করতে প্রাচীনকালে ও মধ্যযুগে এই লোককাহিনির জন্ম হয়েছিল।

সাধারণ বৈশিষ্ট্য

জে এফ রিয়ারলেইন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পৌরাণিক কাহিনী গুলির 6 টি সাধারণ বৈশিষ্টের উল্লেখ করেছেন। এই বৈশিষ্ট্য গুলি হল –

(1) পৌরাণিক কাহিনী গুলি অতীতের সময় থেকেই উত্তরাধিকারসূত্রে বর্তমান মানবসমাজে প্রচলিত হয়।রিয়ারলেইন মতে, পৌরাণিক কাহিনী হল আমাদের অবচেতন মনের কাহিনী বিশেষ যা সম্ভবত আমাদের জিনে লিপিবদ্ধ থাকে।

(2)পৌরাণিককাহিনী গুলি হল প্রাগৈতিহাসিক যুগে ইতিহাস। মানব সভ্যতার উন্মেষের আগে মানুষ কেমন ছিল তার বিভিন্ন খন্ড চিত্র পাওয়া যায় এই কাহিন গুলিতে।

(3) পৌরাণিক বিবরণের ভাষা এমন হয় যা আমাদের উপলব্ধির বাইরে বিষয় গুলির বিবরণ দেয়। অতীন্দ্রিয় অলৌকিক জগতের বিষয়ে আমাদের উপলব্ধির বাইরে। অথচ পৌরাণিক কাহিনী ভাষার মাধ্যমে আমরা সেই অতীন্দ্রিয় বা অলৌকিক জগত সম্পর্কে পরিচিত হতে পারি।

(4) পৌরাণিক কাহিনী গুলি হল কোন সমাজ এবং সম্প্রদায়ের পরিচয় এর মূল ভিত্তি। কোন সমাজ বা সম্প্রদায় পরিচয় কি ছিল তা পৌরাণিক কাহিনী থেকে অনেকটা জানা সম্ভব।

(5) পৌরাণিক কাহিনী সমাজের প্রচলিত ধর্ম বিডি নিয়মগুলি কে স্বীকৃতি দেয়। এর ফলে সামাজিক বিধি নিয়ম সূদৃঢ় হওয়ায় পথ প্রস্তর হয়।

(6)পৌরাণিক কাহিনী হলো এক ধরনের বিশ্বাস বা জীবনকে অর্থবহ করে তোলে।

পৌরাণিক কাহিনী নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি

কুরআনে ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা বলা হয় যে, পুরান হলো সংস্কৃতি সাহিত্য বা গল্প কথা।কোন সমাজের প্রাচীনকালে কি ঘটেছিল তা এখানে প্রকাশ পায়। পুরাণের প্রাচীনত্ব নিয়ে বিশেষজ্ঞদর মনে কোনো সংশয় নেই। পুরান যেহেতু লিখিত সাহিত্য নয়, তাই এর প্রাচীনত্ব সম্পর্কে কোন সঠিক বা যথার্থ সাক্ষ্য প্রমাণ নেই।

সাংস্কৃতিক বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে,পৌরাণিক কাহিনীর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন সৃষ্টি হল বিভিন্ন পশু কথা।পুরাণের পশু কথা গুলিতে পশুপাখির আয়ের প্রধান চরিত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং তাদের ঘিরে পুরাণের লৌকিক কাহিনী গড়ে ওঠে। পশু কথা পশুপাখি গুলির আচার-আচরণে পশুপাখি নয়, এরা মানচিত্রের মতোই আচরণ করে। বিভিন্ন দেশের পুরাণে বর্ণিত বিভিন্ন প্রকার হিসেবে পূজিত হয়।

ইতিহাস রচনায় পৌরাণিক কাহিনীর গুরুত্ব

পৌরাণিক কাহিনিগুলিতে কল্পনা এবং উপমার আধিক্যের জন্য অনেকে ঐতিহাসিক পৌরাণিক কাহিনিগুলিকে অবাস্তব ও ভিত্তিহীন বলে মনে করেন।তবু মানবসভ্যতা, সংস্কৃতি ও ধর্মের ইতিহাসে পৌরাণিক কাহিনি বা মিথগুলির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

1.  বংশলতিকাঃ- পৌরাণিক কাহিনি থেকে বিভিন্ন রাজবংশের নাম, বংশ তালিকা ও পরিচয় জানতে পারা যায়। যেমন— হিন্দু পুরাণগুলি থেকে ভারতের বিভিন্ন রাজবংশের|নাম, বংশ পরিচয় পাওয়া যায়।ড. রণবীর চক্রবর্তী বলেছেন, “পুরাণে বর্ণিত রাজবংশগুলির অস্তিত্ব বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বীকৃত সত্য”।

2.   সময়কাল নির্ণয়ঃ- পৌরাণিক কাহিনিগুলির সঙ্গে তুলনামূলক পদ্ধতিতে যাচাই করে ইতিহাসের বহু সন-তারিখ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে।

3.   রাজ্যের নাম ও অবস্থানঃ- পৌরাণিক কাহিনিগুলি থেকে আমরা বহু প্রাচীন রাজ্যের নাম ও তার ভৌগোলিক অবস্থানের কথা জানতে পারি।

4.   ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনঃ- পৌরাণিক কাহিনিগুলি থেকে আমরা প্রাচীনযুগে মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের কথা জানতে পারি।বর্তমানে প্রচলিত ধর্ম ও সংস্কৃতি ওই প্রাচীন সংস্কৃতি থেকেই উৎপন্ন হয়েছে। পৌরাণিক কাহিনির সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে প্রচলিত কাহিনিগুলি সত্য।

5.   সত্য উপাদানঃ- কল্পনা বা উপমার আধিক্য থাকলেও পৌরাণিক কাহিনিগুলিতে বহু সত্য ও যথার্থ উপাদান লুকিয়ে থাকে। যেমন— গ্রিসের পৌরাণিক কাহিনিগুলি থেকে ট্রয় নগরী ও ট্রয়ের যুদ্ধক্ষেত্রের অবস্থান নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে। এই কারণে বিয়ারলেইন পৌরাণিক কাহিনিগুলিকে গল্পের আকারে সত্য ঘটনার প্রকাশ বলেছেন।

পৌরাণিক কাহিনী গুলি ইতিহাসের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে। বিভিন্ন প্রাণী কাহিনীতে প্রাচীন মানব সংস্কৃতি সম্পর্কিত বিভিন্ন গল্প অতিক্রম করে বর্তমানকালেও  প্রচলিত রয়েছে। প্রাচীন সেই সংস্কৃতি থেকে যেসব আধুনিক মানব সংস্কৃতির উৎপত্তি হয়েছে তারা স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেয় যে,প্রাচীন পৌরাণিক কাহিনীর গল্পে তাদের সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে যেসব কাহিনী প্রচলিত হয়েছে সেগুলি সত্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top