কালারিজম এবং এর প্রভাব

গায়ের রঙ কালো মানে তার ত্বকে ‘মেলানিন’ নামে রঞ্জক পদার্থ, যা ত্বকের বর্ণ নির্ধারণ করে—তা কিছু বেশি রয়েছে। আর এই ‘মেলানিন’ পৃথিবীর সমস্ত রৌদ্রপ্লাবিত অঞ্চলের মানুষের ত্বকে স্বাভাবিক সুরক্ষা আবরণের কাজ করে। যে কারণে কালো ত্বকের মানুষের শ্বেতাঙ্গদের চাইতে ত্বকের ক্যানসারের প্রবণতা অনেক কম। ফর্সা মানুষদের মেলানিন এর পরিমাণ অনেক কম পরিমানে থাকে।
একই জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে যাদের গায়ের রঙ ফর্সা বা হালকা তাদের সঙ্গে বাকিদের যে বৈষম্য তাকে বলা হয় কালারিজম ।যাদের গায়ের রঙ একটু ফর্সা বা হালকা তারা একটু বেশি সুবিধা পেয়ে থাকে। বিশ্বের প্রায় সব সমাজে এর মারাত্মক প্রভাব থাকলেও এই নিয়ে আলোচনা খুব কমই হয়। ফর্সা ত্বকের আবেগ দক্ষিণ এশিয়ার সম্প্রদায়ের মধ্যে কুখ্যাত। দক্ষিণ এশীয় সমাজে এরকম বহু বছর ধরেই চলে আসছে। সেখানে জাতপাতের সাথে সামাজিক অবস্থানের একটা সম্পর্ক রয়েছে। শত বছর ধরে শ্বেতকায় ইউরোপীয়দের শ্রেষ্ঠ এবং নিজেদের জাতি, সমাজ, সংস্কৃতিকে অধস্তন হিসাবে দেখতে বাধ্য হওয়ায় অনেক মানুষই পরিণামে এটাই বিশ্বাস করতে থাকেন এবং সেই দ্বিবিভাজন অনুযায়ী আচরণ করেন। যার ফলে কালারিজম এমনই একটি ধারণা বা বিশ্বাসের প্রতিফলন হয়ে টিকে থাকে যে শ্বেতকায় না হলেও এর কাছাকাছি হলেও তা মানুষের মূল্য বাড়িয়ে দেয়। বিশ্বের যেসব অঞ্চলে দীর্ঘদিন পর্যন্ত ইউরোপীয় উপনিবেশ ছিল সেখানেই কালারিজম শিকড় গেড়ে আছে।

ইতিহাসে দেখা যায় যে অনেক সমাজেই গায়ের রঙ কালো হওয়াকে খারাপ বিষয় হিসেবে দেখা হয়। ধরে নেওয়া হয় যে তারা ‘নোংরা’ এবং ‘কম শিক্ষিত।’ সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে এই ধারণাই চলে এসেছে ।

বিশেষ করে নারীরা এর স্বীকার হয় বেশি । নারীর সৌন্দর্য নিরূপণের প্রধানতম প্রচলিত নির্ণায়ক ও মানদণ্ড হচ্ছে ফরসা ত্বক। যদিও আর্থসামাজিক অবস্থানভেদে এই দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছুটা তারতম্য আছে, তারপরও নারীদের বৃহদাংশই বিশেষ করে শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারের শ্যামা বা কালো মেয়েরা নানা বৈষম্যের শিকার হয়, জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে গায়ের রং নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া, বেড়ে ওঠার সময় নিজ পরিবার, আত্মীয়-বন্ধুদের খোঁটা ও নিগ্রহের শিকার হয়, তাদের অনবরত মনে করিয়ে দেওয়া হয় সমাজের প্রচলিত মান অনুযায়ী তারা অসুন্দর। বাল্যকাল থেকেই তাদের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল করা হয় যে গায়ের রঙের কারণে বিয়ের জন্য তারা আকাঙ্ক্ষিত নয়, বিয়ের বাজারে তাদের মূল্য কম, তাই তাদের ওপর সমাজ আরোপিত দণ্ড বা জরিমানা বেশি হয়। এসব কারণে প্রচলিত মানদণ্ডে তথাকথিত অসুন্দর মেয়েদের ভেতর হীনম্মন্যতা, দুঃখবোধ ও সমাজ বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। পরিবারের উদ্যোগে যেসব বিয়ে হয় এবং তার জন্য পত্রিকায় দেয়া ‘পাত্র চাই’ ‘পাত্রী চাই’ বিজ্ঞাপনের মধ্যেও সেটা পরিষ্কার। সেখানে দশকের পর দশক ধরে ফর্সা মেয়েদেরকেই অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। পাত্রীর পরিবার থেকে দেয়া বিজ্ঞাপনেও মেয়ের রঙ যে ফর্সা সেটি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে।

ব্রিটিশ শাসকেরাই ঔপনিবেশিক শাসনের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় শ্রেষ্ঠ শ্বেতকায় ও অনুত্তম কৃষ্ণকায় এই দ্বিবিভাজন নীতি প্রতিপাদন করেন। নিজেদের শ্রেষ্ঠ, বুদ্ধিমান জাতি ও প্রভুশ্রেণি হিসেবে প্রচার করে, অনুত্তম, অধস্তন অশ্বেতকায় জাতিকে শাসন করার বর্ণবাদী যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করেন। শাসনকাজে সহায়তার জন্য কিছুটা উচ্চ পদে তাঁরা হালকা বর্ণের দেশীয় মানুষদেরই প্রাধান্য দেন আর নিম্নবর্গের কাজে কৃষ্ণকায় মানুষদের নিযুক্ত করে অধস্তন করে রাখেন। এভাবেই গৌর বর্ণ তখনকার সময় উচ্চতর সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা ও সৌন্দর্যের অনুষঙ্গ হয়।বাঙ্গালীর চাকুরে মনোভাব, সাদা চামড়ার প্রতি প্রেম আমাদের পুরনো পেশা, যখন থেকে এরা এদেশে পা রেখেছে আমরা তাদের মোসাহবী করে গেছি, তাই সাদা চামড়া দেখলেই আমাদের মেরুদন্ড বাঁকা হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, ফর্সা মেয়ের ব্যাপারে দুর্বলতার হেতু সম্ভবত রাজার আমল থেকে হেরেমে বন্দী অসূর্যস্পর্শ্যা নারীদের থেকে। রাজার হেরেম সুন্দরীদের আলোবাতাসের অভাবে তাদের ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া চামড়াই সৌন্দর্যের সমার্থক হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে গেছে। তাছাড়া ইরান তুরান প্রভৃতি শীতের দেশের থেকে নিয়ে আসা তুষারকন্যাসম রাজকন্যারা তো আছেনই, সুন্দরীর স্ট্যান্ডার্ড সেট করেছেন। রোদে পুড়ে কামলা দেয়া মাথার ঘাম পায়ে ফেলা লোকের চাইতে, পিছনে ছাতিবাহক নিয়ে বা গাড়িতে চড়ে ঘোড়া পয়সাওয়ালা রইস/ শরীফ ঘরের আদমীরা ( মানুষ যেমন খাটাশই হোক) আমরা কদর করি বেশি। তাদেরও চামড়া রোদে ময়লা হয় না ততটা।বিভিন্ন আকাঙ্ক্ষিত বস্তুর সাথে চামড়ার রঙের মিল মিশটা থেকে তালেগোলে পাকিয়ে ফর্সা প্রীতিটা আমাদের মাথায় একেবারে গেঁথে গেছে।

3 thoughts on “কালারিজম এবং এর প্রভাব”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top