আমার মন বসেনা পড়ার টেবিলে

অনেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে যে তারা পড়াশোনায় একটুও মনোনিবেশ করতে পারে না এবং সেই মন এক জিনিস থেকে অন্য দিকে উড়াল দেয় এবং তাদের পড়াশোনা বাদে অন্য সকল চিন্তাভাবনা থাকে মন জুড়ে। মন জুড়ে থাকে সোশ্যাল মিডিয়া , গেম এবং অন্যান্য বিনোদন এর মাধ্যম। তবে প্রায় প্রত্যেকেরই মনোনিবেশ করার ক্ষমতা রয়েছে। এ ক্ষমতা অর্জন করতে আপনাকে কেবল আপনার অধ্যয়নের ধরণটি সামঞ্জস্য করতে হবে,প্রয়োজনে কিছু নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।

পড়ার প্রতি মনোযোগ বৃদ্ধিতে যে সকল পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে-

  • একটি অধ্যয়নের সময়সূচী তৈরি করুনঃ বিজ্ঞানীরা বলেন, মস্তিষ্কের তথ্য ধারণ ক্ষমতা টানা ২৫-৩০ মিনিট পরিশ্রমের পর হ্রাস পেতে শুরু করে। সুতরাং, একটানা ঘন্টার পর ঘন্টা বই নিয়ে পড়ে থাকার অভ্যাস বন্ধ করতে হবে। পড়ার সময়টুকু ছোট ছোট ভাগে আলাদা করে সাজিয়ে নিতে হবে। টানা যদি অধ্যয়ন করতে হয় তবে একটি শিডিউল তৈরি করুন। ৩০-৪৫ মিনিট অধ্যয়নের পরে ৫-১০ মিনিট করে বিশ্রাম নিন। তথ্য পুনরুদ্ধার করতে এবং প্রক্রিয়া করার জন্য আপনার মস্তিষ্ককে অবশ্যই বিশ্রাম নিতে হবে। পড়াশোনা করার সময় বিরতি নেওয়ার ফলে মস্তিস্কের কাজ করার ক্ষমতা বাড়াবে ।
  • মুখস্থ নয় বুঝে পড়ুনঃ অধিকাংশ শিক্ষার্থী ই না বুঝে গৎবাঁধা মুখস্থ করে ফেলে সবকিছু যা মেধাকে ধ্বংস করে। বুঝে পড়া সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটায়। বুঝে পড়া আপনাকে পরবর্তী টপিকপ পড়ার আগ্রহ যোগাবে।
  • একটানা না পড়ে বিরতি দিয়ে পড়ুনঃ একটানা পড়াশোনা একঘেয়েমির সৃষ্টি করে। একটানা না পড়ে একটু সময় বিরতি নিন। নিজেকে একটু চাঙ্গা করে নিতে এক কাপ চা বা কফি নিতেই পারেন।
  • উদাহরণ গুলো বাস্তব জগতের সাথে মিলিয়ে পড়ুনঃ বেশিরভাগ সময় উদাহরণ গুলো মনে রাখা খুবই কষ্টকর হয়। এক্ষেত্রে আপনি একটু কৌশলী হতে পারেন। আপনি আপনার বাস্তব পৃথিবীর সাথে মিলিয়ে উদাহরণ গুলোকে পড়ুন। এতে আপনি কৌতুকের ছলে ও পড়াশোনা করতে পারবেন।
  •  বিভিন্ন উৎস থেকে পড়ুনঃ একটি নির্দিষ্ট উৎস সবসময় একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের জন্য যথেষ্ট হয় না। একটি নির্দিষ্ট টপিক ভালোভাবে বুঝে পড়ার জন্য আপনাকে একাধিক উৎস থেকে ধারণা নিতে হবে। একাধিক উৎস থেকে পড়ার সময় কমন ব্যাপার গুলো ও খুব সহজেই আয়ত্ত্ব হয়ে যাবে।
  • নিজের মাঝে জ্ঞান বদ্ধ করে না রেখে অন্যকে বুঝিয়ে দিনঃ কোনো টপিক নিজে পড়ে যেটুক বোঝা যায় অন্যকে বুঝিয়ে তার থেকে ও বেশি বোঝা যায়, কনসেপ্ট ক্লিয়ার হয়। এতে করে পড়াশোনা করার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। নিজের মধ্যে তাই জ্ঞান কে সীমাবদ্ধ না রেখে অন্যকে বুঝিয়ে দিন। আইনস্টাইন বলেন, ‘একটা বিষয় তোমার পরিপূর্ণভাবে আয়ত্ত হবে তখনই, যখন বিষয়টি তুমি কাউকে বুঝিয়ে বলতে পারবে।’ পড়ালেখাকে যদি একটি গাড়ির সাথে তুলনা করা হয়, তাহলে যখন একটি টপিক পড়া হবে, তখন সেটি হচ্ছে গাড়ির ইঞ্জিন। কিন্তু শুধু এটুকু দিয়েই কাউকে ঠিকভাবে বুঝানো যাবে না। কেননা, কেবল ইঞ্জিন থাকলেই তো গাড়ি চলে না! গাড়ির অন্যান্য যন্ত্রাংশ – চেসিস, টায়ার ইত্যাদি সব মিলে যুক্ত হয়েই তৈরি হয় একটি গাড়ি।যখন কাউকে বুঝানো হয় একটি টপিক, তখন লক্ষ্য করলে দেখা যায় শুধু বইপড়া জ্ঞান দিয়ে কাজ হচ্ছে না। ঠিক গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশের মতো, সবগুলো ঠিকমতো জোড়া দিলে তবেই চলবে গাড়ি, সেরকম টপিকটার বিভিন্ন আঙ্গিকের উপর সার্বিক একটা ধারণা থাকতে হয়। সুতরাং কাউকে শেখাতে গেলেই, টপিকটার উপর জ্ঞান অনেক গভীরে পৌঁছাতে হয়।
  • মজার ছলে পড়ুনঃ পড়াশোনা কে পড়াশোনার মতো সিরিয়াসলি না নিয়ে মজার ছলে পড়ুন। পড়াশোনা কে চমকপ্রদ বিষয়গুলোর সাথে যুক্ত করে মজার ছলে পড়ুন।সময় চ্যালেঞ্জ করে পড়ুনঃ পড়াশোনা শুরু করার সময় একটা নির্দিষ্ট সময় এর চ্যালেঞ্জ নিন। কত সময়ের মধ্যে কতটুকু শেষ করবেন লিখে রাখুন। দ্রুত সময়ের মাঝে শেষ করার জন্য এটি খুবই ফলপ্রসূ পদ্ধতি।
  • গ্রুপ মেম্বারদের সাথে শেয়ার করে পড়ুনঃ গ্রুপে পড়াশোনা করার অনেকগুলো বেনিফিট রয়েছে। যখন একটি বিষয় একটি গ্রুপে শেয়ার করে পড়বেন এই বিষয়ে সকলের মতামত গুলো প্রত্যেকের বুঝে পড়ার লেভেলটা উন্নত করবে। এছাড়া ও যে সমস্যা গুলোর উদ্ভব হবে তা গ্রুপের সবাই মিলে সহজেই সমাধান করতে পারবেন।
  • নিবিড় মনোযোগ দিয়ে পড়ুনঃ পড়াশোনা যখনই করবেন নিবিড় মনোযোগ দিয়ে পড়বেন। অবাঞ্চিত শব্দ কে পরিহার করা যায় এমন একটি পরিবেশে নিবিড় মনোযোগ দিয়ে পড়লে খুব অল্প সময়ের মধ্যে অনেক কিছুই বুঝে পড়ে ফেলতে পারবেন।
  • বইয়ের সাথে ভালোবাসা তৈরি করুনঃ সর্বোপরি বইয়ের সাথে ভালোবাসা তৈরি করে নিন। যত যাই করুন বইয়ের প্রতি ভালোবাসা আপনাকে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে অনেক বেশি ভূমিকা পালন করবে। আর ভালোবাসা তৈরির জন্য আপনার একাগ্রতার অনেক বেশি প্রয়োজন।
  • অন্যান্য বিষয়ে চিন্তা করার সময় ভাগ করে নিনঃ এমন অনেক সময় রয়েছে যখন আমরা পড়াশুনা করতে গিয়ে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ি কারণ আমাদের প্রতিদিনের বিভিন্ন বিষয় যা আমাদের মনে আসে। আপনি যদি লক্ষ্য করেন যে আপনি দিবাস্বপ্ন দেখছেন, অবিলম্বে থামুন। আপনার মনকে পুনরায় ফোকাস করুন এবং পড়াশোনায় ফিরে আসুন। কেননা আপনি নিজের মনের মালিক । যেহেতু আপনি এটি শুরু করেছেন, আপনিই এটি বন্ধ করতে পারেন! আমরা প্রায়ই মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হই, যদিও মাঝে মাঝে এটি কঠিন মনে হয়। নিজেকে বলুন যে আপনি পড়াশোনা শেষ করার পরে সমস্যা বা আপনার প্রেমিক বা বন্ধু সম্পর্কে ভাববেন, পড়ার সময় শুধুই পড়ুন। এতে করে আপনি পড়ার সময় শান্ত বোধ করবেন কারণ আপনি এটি সম্পর্কে পরে চিন্তাভাবনা করেবেন। যাইহোক,অনেক সময় আপনি পড়াশোনা শেষ করার পরে দেখবেন, সেই ইচ্ছাটি অদৃশ্য হয়ে গেছে। এছাড়াও পড়াশুনার সময় আপনার মনে যে কোনও কাজ বা ভাবনার বিষয় এলে কোথাও লিখে রাখুন। সেই কাজগুলো আপনি বিশ্রামের সময় কাজগুলো করুন বা ভাবনার বিষয়গুলো সম্পর্কে ভাবেন।
  • পর্যাপ্ত ঘুমিয়ে নিন : একজন মানুষের দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন। পর্যাপ্ত পরিমাণ না ঘুমালে মস্তিষ্ক ঠিকমত কাজ করে না। এতে করে পড়ার প্রতি মনোযোগও কমে যায়। তাই অবশ্যই পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমাতে হবে।
  • পুষ্টিকর খাবার খানঃ মানুষের মস্তিষ্ক সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন পুষ্টির, যা পাওয়া সম্ভব পুষ্টিকর খাবার থেকে। পুষ্টিকর খাবার মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে মনোযোগ বৃদ্ধি করতে সাহায্য করবে।
  • মিষ্টি জাতীয় খাবার খান : মিষ্টি জাতীয় খাবার দেহে যাওয়া মাত্র সারা শরীরকে সতেজ করে তোলে। এছাড়া ব্রেনের কাজ করার ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
  • মেডিটেশন করুন : মেডিটেশন মন ও শরীর দুইই প্রাণবন্ত করে তোলে। মেডিটেশনের ফলে শরীরের ক্লান্তি দূর হয় এবং কাজ করা ক্ষমতা বেড়ে যায়। এছাড়া মেডিটেশনের ফলে ব্রেন এর রিফ্রেশমেন্ট ঘটে। ফলে পড়া খুব দ্রুত মুখস্ত হয়ে যায় এবং তা বহুক্ষণ মনে থাকে।

এভাবে পড়লে পড়াটা ভাল মনে থাকে। তখন পড়াটা বোরিংও লাগবে না এবং পড়াটা ভাল মনেও থাকবে। তো আজই এই উপায়গুলো অ্যাপলাই করে দেখুন আর কমেন্ট করে আমাদের জানান এই পদ্ধতিগুলো  ব্যাবহার করে আপনার কতটুকু উপকার হল।

4 thoughts on “আমার মন বসেনা পড়ার টেবিলে”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top